ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

মেধাবীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা

মেধাবীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা
×
×

মাজহারুল আলম মিলন, পীরগঞ্জ (রংপুর)

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বলা হয়, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড যদি দুর্বল, ভঙ্গুর ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তবে জাতির ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, তা রংপুরের পীরগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনায় পরিষ্কার। উপজেলার ৮০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে চার হাজার ১৫ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে দুই হাজার ৩৫০ জন। তবে এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৭টি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে ২৫৫ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৬৫ জন। 
প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে পীরগঞ্জের বেশ কয়েকটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করুণ অবস্থা সামনে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, উপজেলার কুমারপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগে মোট ১৮ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিলেও পাস করেনি কেউ। একই চিত্র ঘাষিপুর উচ্চ বিদ্যালয়েও; সেখানেও ১৮ জনের মধ্যে শূন্য পাস, যার মধ্যে তিনজন পরীক্ষা শুরুর দিন থেকেই অনুপস্থিত ছিল।

অন্যদিকে, গুর্জিপাড়া বালিকা বিদ্যালয়ে মাত্র এক পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করায় ফলের হার শতভাগ। পরিসংখ্যানের বিচারে এটি শতভাগ সাফল্য মনে হলেও শিক্ষার মান বিচারে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একইভাবে সাতগড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৪ জনের মধ্যে একজন, ছোট উজিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ জনের মধ্যে একজন, সরলিয়া বেতকাপা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯ জনের মধ্যে দুজন, রায়পুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ১৪ জনের মধ্যে তিনজন, গিলাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২২ জনের মধ্যে চারজন এবং হরিণ শিং উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৭ জনের মধ্যে চারজন পাস করেছে।
এ ছাড়া শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮ জনের মধ্যে পাঁচজন, কাউয়া পুকুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৪ জনের মধ্যে পাঁচজন, বড় আলমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৩ জনের মধ্যে ছয়জন, হলদিবাড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে আটজনের মধ্যে ছয়জন, ঝাড় আমবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০ জনের মধ্যে সাতজন, হাতীবান্ধা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৬ জনের মধ্যে সাতজন এবং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় চৈত্রকোলে ২৫ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র আটজন। সব মিলিয়ে চিহ্নিত এই ১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ২৫৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৬৫ জন। অর্থাৎ, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে। পীরগঞ্জ উপজেলার বাকি ৬৩টি বিদ্যালয় থেকে তিন হাজার ৭৬০ জনের মধ্যে পাস করেছে দুই হাজার ২৮৫ জন। তুলনামূলক চিত্রে উপজেলার ১৭টি বিদ্যালয়ের পারফরম্যান্স অত্যন্ত হতাশাজনক।
পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটিতে শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা অস্বাভাবিক রকম বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ছোট উজিরপুর ও সাতগড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৩৫ জনের বেশি। হলদিবাড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে আট পরীক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৬ জন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও এই বিপর্যয় প্রশ্ন তোলে পাঠদানের গুণগত মান নিয়ে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ফল ভালো করতে না পারা বিদ্যালয়গুলোতে কোনো কোনোটিতে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে মেধাবীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও ডিজি প্রতিনিধির যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। এ ছাড়া দলাদলি, রাজনৈতিক প্রভাব ও মামলা-মোকদ্দমায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। 
স্থানীয়রা মনে করেন, পীরগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষার এই রোগ নিরাময়ে সামান্য তদারকি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। পরীক্ষার ফলের জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর দায় না চাপিয়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক অডিট করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিতের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। 
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জানান, ফল বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান খারাপ ফল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন

×