পদ্মার ঢেউয়ে বিদ্যালয় ঘিরে শঙ্কা
পদ্মাপারে পড়ে আছে ভবনের ভেঙে পড়া ছাদ। গতকাল শুক্রবার শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার আলতাফ হোসেন খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সমকাল
শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বছর আগেও বিদ্যালয় থেকে পদ্মা নদী ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। তীর ভাঙতে ভাঙতে সেই নদীর ঢেউয়ে ভাঙছে বিদ্যালয়ের মাঠ। ইতোমধ্যে একাংশ গেছে নদীতে। আতঙ্কে খুলে ফেলা হয়েছে বিদ্যালয়টির সীমানাবেড়া। গুরুত্বপূর্ণ আসবাবও সরিয়ে নিচ্ছেন শিক্ষকরা। এরই মধ্যে খোলা শ্রেণিকক্ষে চলছে শিশুদের পড়াশোনা।
গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পদ্মা নদীর চরে অবস্থিত ১২২ নম্বর আলতাফ হোসেন খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে। বিদ্যালয়টি পড়েছে উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খান কান্দি গ্রামে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২১৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে এ বিদ্যালয়ে আছেন চারজন শিক্ষক। নদীভাঙনের আতঙ্কে দিনে গড়ে ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী আসে ক্লাস করতে। শুক্রবার দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে পদ্মার দূরত্ব কমে মাত্র ৪০ মিটারে এসেছে। কখন বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা বলছেন, ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত সময়ে ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় নদীতে বিলীন হতে পারে পুরো বিদ্যালয়।
গতকাল দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের সামনের মাঠের মাটি ভেঙে নদীর পানিতে পড়ছে। কয়েকটি গাছও ভেঙে পড়ে আছে। পাশেই নদীতে বিলীন হওয়া একটি ভবনের ছাদ ভেঙে পাড়ের দিকে হেলে রয়েছে। বিদ্যালয়টির টিনের সীমানাবেড়া খুলে ফেলা হয়েছে। আলমারিসহ বিভিন্ন আসবাব বিদ্যালয়ের পেছনের খোলা জায়গায় জড়ো করে রাখা। টিনের কাঠামোয় তৈরি বিদ্যালয়টিতে চারটি শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের একটি কক্ষ। মেঝেটি পাকা।
২০২৪ সালের আগস্টে একই ইউনিয়নের পাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২০২৫ সালের আগস্টে রিজিয়া আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পদ্মায় তলিয়ে যায়। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, এবারও তারা এই বিদ্যালয়টি হারাতে পারেন।
দুর্গম চরের আলম খান কান্দি গ্রামের উত্তর দিয়ে পদ্মার মূল ধারা। দক্ষিণ পাশে পদ্মার অপেক্ষাকৃত সরু খাতটি বয়ে গেছে। চারপাশে নদী থাকায় এলাকাবাসীর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। ২০১৭ সালে এখানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ৩৩ শতাংশ জমি দান করেন। তাঁর নামেই হয় বিদ্যালয়টি। এই বিদ্যালয়ের পাশেই বাড়ি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তারের। গতকাল শুক্রবার তাকে পাওয়া যায় মাঠেই। এই শিশুটি বলল, ‘নদী ভাঙতে ভাঙতে আমাদের স্কুলের মাঠে চলে এসেছে। যে কোনো সময় স্কুল ভেঙে যেতে পারে। খুব ভয় লাগে, কখন স্কুল ভেঙে যায়। স্কুলটি নদীতে চলে গেলে আমরা আর এখানে পড়াশোনা করতে পারব না। তখন আমরা কোথায় পড়াশোনা করব? আমরা চাই, আমাদের স্কুলটি রক্ষার ব্যবস্থা করা হোক।’
শিক্ষক নাইমুর রহমান খানকেও পাওয়া যায় এদিন। তিনি বলেন, ভাঙনের আতঙ্কে বিদ্যালয়টি থেকে অন্তত ১০০ শিক্ষার্থী অন্য বিদ্যালয়ে চলে গেছে। শিক্ষকদেরও সব সময় উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়। বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়িতে গিয়েও এলাকাবাসীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে নদীভাঙনের খোঁজখবর রাখতে হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামীম খান বৃহস্পতিবার বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুল শেষে বাড়িতে ফিরে পরদিন সকালে বিদ্যালয়টি দেখতে পারব কিনা, সেই চিন্তায় থাকি।’ ভাঙনে তলিয়ে যেতে পারে পুরো বিদ্যালয়, এই আশঙ্কায় ইতোমধ্যে কিছু মালপত্র তারা সরিয়ে নিয়েছেন বলেও জানান।
পূর্ব নাওডোবা ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খানের ভাষ্য, ‘এলাকায় ভাঙন শুরু হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) অনেকবার ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু এলাকাটি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ সময়মতো নেওয়া হয়নি। এখন বিদ্যালয়টিও ভাঙনের মুখে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি যে কোনো সময় নদীতে চলে যেতে পারে।’
বিদ্যালয়টি ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকার কথা স্বীকার করে শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম মোবাইল ফোনে বলেন, ভাঙনের আগেই বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। অবকাঠামো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভাঙনের শিকার হলে যাতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।
শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন গতকাল সমকালকে বলেন, আলম খান কান্দি এলাকায় ভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। চরাঞ্চলে বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য পাউবোর কোনো অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়টি যে ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে, এ বিষয়ে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা বিভাগও জানায়নি। শিগগিরই তারা এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
- বিষয় :
- পদ্মা