নেত্রকোনা
এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যানসহ সাতজনের নাম এজাহারে
প্রতীকী ছবি
কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:১৯
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগে দায়ের করা এজাহারে রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুলসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে এনআইডি তৈরির নথি সংগ্রহ, যাচাই ও সার্ভারে তথ্য আপলোডের প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান।
এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে চাকরিচ্যুত তিনজন, ইউপি চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল, কথিত নূর হালিমার পরিচয়দানকারী বাবা ওমর আলী এবং উপজেলা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়া রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এজাহারে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এর আগে, গত ৭ অক্টোবর দৈনিক সমকাল-এ ‘কলমাকান্দায় তদন্তাধীন কয়েকটি এনআইডির নথিপত্র গায়েবের অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে তদন্তাধীন কয়েকটি এনআইডির সংশ্লিষ্ট নথি খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর উপজেলা নির্বাচন অফিসের এনআইডি নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সর্বশেষ থানায় অভিযোগ ও দুজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
নির্বাচন অফিস-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ১১ আগস্ট রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসের আইডি ব্যবহার করে নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমানের এনআইডি তৈরির কাগজপত্র সার্ভারে আপলোড করা হয়। ওই রাতে শুধু এই দু’জনের তথ্যই আপলোড করা হয়েছিল বলে সূত্রটি জানিয়েছে। মুজিবুর রহমানের ফাইল নম্বর ১২১১৫০৭৯১। তার ঠিকানা হিসেবে উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। অফিসের আইডি ব্যবহার করে তথ্য আপলোড করেছিলেন কে? ওই আইডিতে কার কার প্রবেশাধিকার ছিল? আবেদনকারীদের পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইয়ের দায়িত্বে কারা ছিলেন? সার্ভার লগ, ব্যবহারকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করলে কি প্রকৃত ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে? তদন্তে এসব বিষয় যাচাই করা হলে তথ্য আপলোডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমানের করা অভিযোগে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়ার নাম এসেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের পাশাপাশি অফিসের সিসিটিভি নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োজিত একজন ব্যক্তি কীভাবে এনআইডি নিবন্ধন ও তথ্য আপলোডের মতো কারিগরি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি নিজে তথ্য আপলোড করেছিলেন, নাকি অন্য কেউ তার পরিচয় কিংবা অফিসের আইডি ব্যবহার করেছিলেন—তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সার্ভার লগ, দায়িত্ব বণ্টনের নথি, অফিসে প্রবেশের তথ্য এবং সিসিটিভি-সংক্রান্ত রেকর্ড পরীক্ষা করা জরুরি।
এজাহারে নাম থাকা রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে দলটির সদস্য বলে জানা গেছে। তবে এনআইডি নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমাদের ওয়েবসাইটে এসব তথ্য নেই। বাইরে থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ তৈরি করে নিতে পারে তারা।’
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের ওয়েবসাইটে এসব তথ্য নেই এবং বাইরে থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে সনদ তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট সনদ কীভাবে তৈরি ও ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইস্যু করা হয়েছিল কি না এবং সনদের সত্যতা যাচাইয়ে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে, কথিত নূর হালিমার পরিচয়দানকারী পিতা ওমর আলীর বক্তব্য, পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আবেদনপ্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা যাচাই করা দরকার। অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে তিনজন আউটসোর্সিং কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে বদলির সূত্রে কলমাকান্দায় যোগ দেন। তার যোগদানের আগের সময়ের কিছু ভোটার নিবন্ধন নিয়েও তদন্ত চলছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ফলে কোনো সময়ে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, তখন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে কারা ছিলেন, চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল এবং থানায় অভিযোগ দায়েরের আগে কী ধরনের তদন্ত করা হয়েছে—এসব বিষয় আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। চাকরিচ্যুতি ও অভিযোগ দায়েরের মধ্যকার সময়গত সম্পর্ক থাকলেও শুধু এ কারণে কোনো উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার ধারিয়া গ্রামের আনিছ মিয়ার ছেলে চাকুরিচ্যুত কাঞ্চন মিয়া (২৯) এবং শেরপুর সদর উপজেলার দড়িপাড়া গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে বর্তমান পরিচ্ছন্ন কর্মী মঞ্জুরুল মিয়া। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য নয়। এনআইডি তৈরির আবেদন গ্রহণ, পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই, প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ, অনুমোদন এবং সার্ভারে তথ্য আপলোড—প্রতিটি ধাপে কার কী দায়িত্ব ছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য নিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। তাই, এ ধরনের অভিযোগের তদন্তে শুধু কয়েকজন কর্মীর ভূমিকা নয়, পুরো নিবন্ধনপ্রক্রিয়া ও তদারকির ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব।