ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আমন ধান সংগ্রহ করা নিয়ে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা

আমন ধান সংগ্রহ করা নিয়ে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা
×
×

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি খাদ্যগুদামে আমন ধান কেনার সরকারি উদ্যোগ প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় পড়েছে। ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে ১৩টি উপজেলার কৃষি অফিসে প্রকৃত কৃষকের তালিকা হয়েছে। তবে তালিকা দিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

অভিযোগ রয়েছে, কৃষি কর্মকর্তাদের তালিকার তোয়াক্কা না করে পছন্দের লোক দিয়ে লটারির মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করে উপজেলা খাদ্য অফিস। এ কারণে তালিকা প্রণয়নে অনীহা প্রকাশ করছেন ময়মনসিংহ জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা। সরকারের কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি ‘কৃষকের অ্যাপ’ও দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। এতে ২০২৬-২৭ মৌসুমে আমন ধান সংগ্রহ নিয়ে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে।  

জেলা খাদ্য অফিসের তথ্যমতে, গত বছর ময়মনসিংহে আমন ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল দুই হাজার ২৫৬ টন। ১৩টি উপজেলার ১৯টি গুদামে একযোগে চলে ধান সংগ্রহ অভিযান। তবে চলতি বছর আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এখনও ঠিক করেনি সরকার। 
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখা থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে বলা হয়, আগামী নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে আমন সংগ্রহ মৌসুম। এ জন্য ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা-২০১৭’ অনুযায়ী প্রকৃত কৃষকের তালিকা ২১ অক্টোবরের মধ্যে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দুই উপায়ে কৃষক নির্বাচন করার কথা। খাদ্য বিভাগের ডিজিটাল মাধ্যম ‘কৃষকের অ্যাপ’ এবং উপজেলা কৃষি অফিসের তৈরি কৃষকের তালিকা। কিন্তু ময়মনসিংহ সদর, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া, ত্রিশাল, গফরগাঁও, নন্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ, ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট, ফুলপুর, তারাকান্দা, নান্দাইল ও হালুয়াঘাট উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোবাইল ফোনে ‘কৃষকের অ্যাপ’ ইনস্টল করার পর তা খোলে না। সার্ভার ত্রুটি ও কারিগরি জটিলতায় অ্যাপটি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে সাধারণ চাষিরা অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অ্যাপ বিকল হওয়ায় খাদ্য সংগ্রহের পুরোটাই নির্ভর করার কথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তালিকার ওপর। কিন্তু এতেও তৈরি হয়েছে অসন্তোষ। একাধিক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিবছর আবাদকারী প্রান্তিক ও প্রকৃত কৃষকদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ায় তালিকা পাঠান তারা। কিন্তু খাদ্য অফিস সেই তালিকা অনুযায়ী ধান না কিনে নিজেদের সুবিধাজনক লোকজনের তালিকা তৈরি করে লটারির নামে ধান সংগ্রহ দেখায়। পরে অভিযোগ উঠলে বলা হয়, লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের অভিযোগ, তাদের পাঠানো তালিকার ৭০-৮০ শতাংশ কৃষক বাদ দিয়ে গুটিকয়েকের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়। বাকি জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী ও খাদ্য অফিসের সিন্ডিকেটের লোকজনকে জায়গা দেওয়া হয়। এ কারণে প্রতিবছর কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কৃষকদের অসন্তোষের মুখে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে এবার নতুন করে পুনরায় কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনীহা দেখাচ্ছেন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা।

ময়মনসিংহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ কৃষক রয়েছেন। কিন্তু খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও হয়রানির কারণে সাধারণ কৃষকরাও খাদ্যগুদামে ধান দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
ময়মনসিংহের কয়েকজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সমকালকে জানান, তারা কষ্ট করে মাঠ পর্যায় থেকে প্রকৃত কৃষকের এনআইডি, মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর মিলিয়ে নিখুঁত তালিকা পাঠান। কিন্তু খাদ্যগুদামে ধান জমা নেওয়ার সময় সেই তালিকার কোনো প্রতিফলন থাকে না। খাদ্য অফিস নিজেদের মতো করে তালিকা বানিয়ে লটারির অজুহাত দেয়। এতে কৃষকদের তোপের মুখে পড়তে হয় তাদের। 

যদি তাদের তালিকাই মূল্যায়ন না করা হয়, তবে প্রতিবছর এমন তালিকা পাঠানোর কোনো মানে হয় না।
একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সমকালকে বলন, ‘প্রতিবছর আমরা যে তালিকা দেই, সে অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ধান নেওয়া হয় না। অনেক কৃষক আমাদের কাছে এসে অভিযোগ করেন তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা তুলে মাত্র ৫০০-১০০০ টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়। আর ধান দিতে গেলে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়।’

‘কৃষকের অ্যাপ’ সচল না থাকা ও কৃষি কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, অ্যাপের কারিগরি দিকটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। আর সংগ্রহ নীতিমালার আলোকেই উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমেই কৃষক চূড়ান্ত করা হয়। এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই। অ্যাপের কার্যক্রম সারাবছর বন্ধ থাকে, নির্দিষ্ট সময়ে এটি খুলে দেয় সরকার।
সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সদস্য ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, ডিজিটাল ‘কৃষকের অ্যাপ’ সচল না থাকা এবং কৃষি ও খাদ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরাই লাভবান হচ্ছে। অবিলম্বে অ্যাপটি সচল করা এবং কৃষি অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকৃত কৃষকদের শতভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান সমকালকে বলেন, ধান সংগ্রহ অভিযানের জন্য যে অ্যাপটি আছে, সেটি কার্যকর রাখার জন্য নজরদারি দরকার। যেহেতু আমাদের কৃষকরা এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়ে ওঠেননি, তাই কৃষি কর্মকর্তারাই তালিকা তৈরির প্রধান ভরসা হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষকের যে তালিকা কৃষি কর্মকর্তারা খাদ্য বিভাগে পাঠান, তার মাধ্যমেই শতভাগ ধান সংগ্রহ করা উচিত সরকারের।
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমরা কৃষকের কাছ থেকে ধান নিলেও তাদের আমরা চিনি না। এজন্য কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের তালিকা নিতে হয়।’

আরও পড়ুন

×