ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ড্যামের ওপর দিয়ে চলছে বালু-পাথরের নৌকা!

ড্যামের ওপর দিয়ে চলছে বালু-পাথরের নৌকা!
×
×

সেতুর নিচে পানিতে তলিয়ে থাকা রাবার ড্যামের ওপর দিয়ে চলে পাথরবোঝাই নৌকা সমকাল

পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সময় ও জ্বালানি তেল বাঁচাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্ত নদী জাদুকাটার পরিবর্তে বিশ্বম্ভরপুরের পাহাড়ি নদী মিছাখালী দিয়ে বালু-পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। তাতে ১০ বছর আগে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীতে নির্মিত রাবার ড্যামটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণে আগামী বোরো মৌসুমে ওই উপজেলার (বিশ্বম্ভরপুর) আঙ্গারুলি ও পুটিয়ার হাওরের ফসল উৎপাদন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। মিছাখালী রাবার ড্যাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম।

আঙ্গারুলি ও পুটিয়ার হাওরের প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিকে আগাম বন্যা থেকে রক্ষা করে এই ড্যাম। স্থানীয় কৃষকদের কাছে এটি বোরো আবাদের অন্যতম ভরসা। একসময় ভারতের মেঘালয় থেকে আসা পাহড়ি ঢল মিছাখালী দিয়ে নেমে মাঠ তলিয়ে যেত। এ আশঙ্কা নিয়ে হাওর অঞ্চলের ২০টির মতো গ্রামের কৃষকরা চাষবাস করতেন। রাবার ড্যাম নির্মাণের পর থেকে এই দুশ্চিন্তা কমেছিল ওই অঞ্চলের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের। 

এলাকাবাসী জানান, সম্প্রতি বালু-পাথর উত্তোলনের একটি অসাধু চক্র যাদুকাটা নদীর স্বাভাবিক নৌপথ এড়িয়ে রাবার ড্যামের ওপর দিয়ে নৌকা চালাচ্ছে। এতে সময় ও তেল খরচ কম হলেও রাবার ড্যামের রাবার ছেড়ার বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রাবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাঁধে পানি ধরে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে, যার প্রভাব পড়বে আগামী বোরো ফসল উৎপাদনের ওপর।

রাবার ড্যাম পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো তদারকি করা হচ্ছে না। অন্যদিকে বিএডিসির পাল্টা অভিযোগ, প্রকল্প থেকে সুবিধা ভোগ করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির আগ্রহ নেই। সংস্থাটির দাবি, স্কিমের সুফল নেওয়া হলেও দায়িত্ব পালনে কমিটি উদাসীন।

সিরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সুবহান বলেন, এই রাবার ড্যামে পেরিয়ে প্রতিনিয়ত বালু-পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। খালি নৌকাগুলোও এই পথে ফিরে যাচ্ছে। দিন-রাত অবাধে নৌকা চলাচলের কারণে রাবার ড্যাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নৌকার ইঞ্জিনের পাখার আঘাতে রাবার কেটে গেলে প্রতিবছরই এটি মেরামত করতে হয়। এতে আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি বোরো ধান নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়।

ওমরপুর গ্রামের বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলেন, রাবার ড্যামের ওপর দিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ করতে আগে অ্যাঙ্গেল দিয়ে ফাঁকা অংশগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। একটি অসাধু চক্র নৌকা চলাচলের সুবিধার্থে সেগুলো ভেঙে আবার ফাঁকা স্থান তৈরি করেছে। তিনি বলেন, নৌকার ইঞ্জিনের পাখার আঘাতে রাবার কেটে গেলে সেটি মেরামতের জন্য চট্টগ্রাম থেকে প্রকৌশলী আনতে হয়। দুই বছর আগে এই রাবার ড্যাম মেরামতে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, রাবার ড্যামটির সংরক্ষণ ও মেরামতের জন্য বিএডিসি থেকে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। নৌকা চলাচল বন্ধ করতে বিএডিসি অ্যাঙ্গেল দিয়ে বাধা তৈরি করেছিল। বালু-পাথরের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি অসাধু চক্র এবং স্থানীয় কিছু মানুষের যোগসাজশে সেগুলো ভেঙে নৌকা চলাচল অব্যাহত রয়েছে। 
সিরাজপুর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ বাচ্চু মিয়া বলেন, স্থানীয় একটি পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে ড্যামটি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া আছে। কমিটির পক্ষে একা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ড্যাম নির্মাণের সময় এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুজন লোক নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা হয়নি। 

মিছাখালী রাবার ড্যাম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী সালেহ আহমদ বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে মিছাখালী রাবার ড্যাম এবং এর ওপর নির্মিত সেতুর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। রাবারের ওপর দিয়ে প্রতিনিয়ত বালু-পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করায় এটি বিশাল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, ড্যামটি রক্ষায় পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে সভা করা হয়েছে এবং এলাকাবাসীকে সচেতন করতে মাইকিংও করা হয়েছে, যাতে কেউ বালু-পাথরবোঝাই নৌকা নিয়ে চলাচল না করেন। 

বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী (সেচ) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, রাবার ড্যামটির সংস্কার ও সুরক্ষার জন্য একটি প্রাক্কলন তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এরপরও সিলেট প্রকল্পের আওতায় প্রাক্কলনটি যুক্ত করে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ না নিলে অ্যাঙ্গেল বসিয়েও নৌকা চলাচল বন্ধ করা কঠিন হবে। 

পরিচালনা কমিটির ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ড্যাম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্প ও সুবিধা থেকে কমিটির সদস্যরা উপকৃত হলেও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনে তাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। গত বছর এক সভায় উপকারভোগী হাওরের প্রতি একর জমির জন্য বছরে ৫০ টাকা করে আদায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে তিনি জানান। প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমির ফসল রক্ষার জন্য ড্যামটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে আগাম বন্যায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চলতি বছর এই অর্থ আদায় করা হয়নি। এর আগে আদায় করা অর্থের হিসাব কোথায়, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এ বিষয়ে দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মিছাখালী রাবার ড্যাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছবাব মিয়া বলেন, কৃষকরা বলছেন, সরকারের স্থাপনা, আমরা কেন টাকা দেব? আমি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাঝে মাঝে জরুরি প্রয়োজনে খরচ করেছি। বিএডিসি সংস্কার ও মেরামতের জন্য অর্থ পেলেও এটি কীভাবে ব্যয় করে কমিটিকে জানায় না। আর আমরা যেহেতু কোনো টাকা তুলতে পারছি না, কিসের হিসাব দেখাব?

আরও পড়ুন

×