ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষকদের বদলি ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

শিক্ষকদের বদলি ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ
×
×

ফাইল ছবি

সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীর চারঘাটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচজন সহকারী শিক্ষকের বদলি ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নীতিমালা মেনে বদলি কার্যক্রম সম্পন্ন করার দাবি করলেও নীতিমালা লঙ্ঘন, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার না দেওয়া ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এদিকে শিক্ষার্থী বেশি এমন বিদ্যালয়ের বদলি করায় সেখানে শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। বিপরীতে শিক্ষার্থী কম এমন বিদ্যালয়ে বদলির পর শিক্ষকসংখ্যা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১ সেপ্টেম্বর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. ফাতেমা খাতুন আন্তঃউপজেলা বদলির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। আগ্রহী শিক্ষকদের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়। এতে প্রায় ১৫ জন শিক্ষক আবেদন করেন। তাদের পাঁচজনকে ২৯ সেপ্টেম্বর বদলির নির্দেশনা দেন বদলি কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. ফাতেমা খাতুন।

নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বিদ্যালয়ে পাঁচজনের কম শিক্ষক থাকলে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে বদলি কার্যক্রম পরিচালনার কথা। 

বদলির পর অসামঞ্জস্য
খড়েরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লুৎফর নাহার নীলাকে চক ঝিকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। জানা গেছে, কিছুদিন আগে খড়েরবাড়ী বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আজিম উদ্দিন অবসরে যান। লুৎফর নাহার নীলাকে বদলির পর এখানে শিক্ষক কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র তিনজনে। অপরদিকে নীলাকে বদলির আগে চক ঝিকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি যোগদানের পর যা বেড়ে হয়েছে ছয়জন। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৫৬ জন। নীতিমালায় প্রতি ৪০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক বিবেচনায় নিলে সেখানে পাঁচজন শিক্ষকই যথেষ্ট ছিল।

খড়েরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমরা এখন মাত্র তিনজন শিক্ষক। অফিসিয়াল কাজে আমি শিক্ষা অফিসে গেলে ওই সময়ে তিনটি ক্লাস চালু রাখার মতো শিক্ষকও থাকে না। খুব দ্রুত এই সংকট দূর করার দাবি জানাচ্ছি।’

অসামঞ্জস্য দেখা গেছে পুঠিমারী ও রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। পুঠিমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২৬৬ জন। সেখানে শিক্ষক ছিলেন আটজন। এই বিদ্যালয় থেকে একসঙ্গে নাসরিন নাহার ও মাহফুজুর রহমানকে রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। এতে পুঠিমারী বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুজন শিক্ষক যোগ দেওয়ায় বেড়ে হয়েছে ছয়জন। বিদ্যালয়টিতে খাতা-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭১ জন। তবে সরেজমিনে ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। 

পুঠিমারী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাফিয়া খাতুন বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে চার বছরের শিশুদের ভর্তি কার্যক্রম চালু আছে। এখানে আটজন শিক্ষকই জরুরি ছিল। কিন্তু একসঙ্গে দুজনকে বদলি করা হয়েছে। এতে ২৬৬ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ যে বিদ্যালয়ে তাদের বদলি করা হয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থী তেমন নেই।’

মানা হয়নি জ্যেষ্ঠতা
উপজেলার অনুপামপুর-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ছয়জন শিক্ষক ছিলেন। সেখান থেকে শাহিন সুলতানাকে নাওদাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। অথচ নাওদাড়া বিদ্যালয়ে বদলির জন্য আবেদন করা আরও পাঁচজন শিক্ষক চাকরিতে যোগদানের দিক থেকে তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ ছিলেন।

বদলির সুযোগ না পাওয়া এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে চাকরিতে যোগ দেওয়া জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরাও বদলির আবেদন করেছিলেন। তাদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নবীন শিক্ষকদের বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়াও অধিকাংশ বদলি নীতিমালা অনুযায়ী হয়নি। এ প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁর।

উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংকট রয়েছে, সেখানে সমন্বয় করার উদ্দেশ্যেই বদলি করা হয়। বদলির পর কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট আরও বেড়ে গেলে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অনিয়মের অভিযোগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। নীতিমালা অনুযায়ী বদলি করে প্রাথমিক শিক্ষার সংকট দূর করার দাবি জানান তিনি। 

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বদলি কমিটির সদস্যসচিব ফাতেমা খাতুন বলেন, উপজেলা বদলি কমিটি নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে বদলির সুপারিশ করেছে। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেনি। বদলির পর যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে, সেখানে নতুন যোগদানকারী শিক্ষকদের পদায়ন করা হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন বলেন, বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করে দেখা হবে। বিদ্যালয়গুলোতে যেন শিক্ষক সংকট না থাকে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×