ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

লালমনিরহাট

মা-বাবার সঙ্গে ইটভাটায় শিশুরা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার শঙ্কা

মা-বাবার সঙ্গে ইটভাটায় শিশুরা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার শঙ্কা
×
×

ছবি: সংগৃহীত

হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৪

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা হেলিপ্যাড মাঠ। গত শনিবার বিকেলবেলা। তিনটি ভাড়া করা বাস দাঁড় করানো আছে। তাতে নারী, শিশুসহ শ্রমিকরা বসে আছেন। তারা নরসিংদী, কুষ্টিয়া, বগুড়াসহবিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় কাজ করতে যাচ্ছেন। শ্রমিকদের অর্ধেকের বেশি শিশু। তাদের বেশির ভাগই মা-বাবার সঙ্গে কাজে যাচ্ছে। এদের অনেকে স্কুলশিক্ষার্থী।

বার্ষিক পরীক্ষা সামনে, অথচ বই-খাতা ছেড়ে এসব ছেলেমেয়ে তাদের মা-বাবার সঙ্গে ইটভাটায় যাচ্ছে। সেখানে টানা ছয় মাস কাজ করে বাড়ি ফিরবে। এতে বার্ষিক পরীক্ষা দেওয়া হবে না অনেকের। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষকরা।

বাসে বসে হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, এবারই প্রথম মা-বাবার সঙ্গে ইটভাটায় কাজে যাচ্ছে সে। এ কারণে এবার তার বার্ষিক পরীক্ষা দেওয়া হবে না। একই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী বলে, ‘মা-বাবার সঙ্গে যাওয়ার কারণে আমার এক বছর গ্যাপ যাবে। কাজ শেষে ছয় মাস পর ফিরে আমাকে আবার ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে হবে।’এই দুজনের মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীরই পড়াশোনায় ছেদ পড়ছে।

উপজেলার সাতটি বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি বিদ্যালয়ের পাঁচ থেকে সাত শিশুশিক্ষার্থী তাদের মা-বাবার সঙ্গে ইটভাটায় কাজ করতে গেছে। সাধারণত প্রতিবছর অক্টোবর-নভেম্বরে ইটভাটার মৌসুম। তখন শ্রমিকরা দল বেঁধে কাজে যান। এবারও প্রতিদিন হাতীবান্ধা থেকে ভাড়া করা দূরপাল্লার বাসে করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুদের ইটভাটায় যেতে দেখা যাচ্ছে।

শ্রমিক পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয় মাস কাজ করার চুক্তিতে প্রতিটি পরিবার ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আগাম নিয়েছে। ইটভাটায় কাজ করে এই টাকা শোধ করবেন। এ জন্য শ্রমিক সর্দার কিংবা ইটভাটার মালিকদের ভাড়া করা বাসে তাদের কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। সেখানে মা-বাবার পাশাপাশি শিশুরাও ইট তৈরির কাজে যুক্ত হবে। মৌসুম শেষে প্রায় ছয় মাস পর তারা বাড়ি ফিরবে।

উপজেলার সিংগিমারী, গড্ডিমারী, সানিয়াজান, বড়খাতা, ফকিরপাড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের শ্রমিকরা অগ্রিম টাকা নিয়ে পরিবারসহ বাড়ি ছাড়ছেন। তাদের সঙ্গে যাচ্ছে স্কুলপড়ুয়া সন্তানরাও। এতে গড্ডিমারী, চর গড্ডিমারী, সারডুবী, পণ্ডিতপাড়া, পিত্তিফাটা, নিজ গড্ডিমারী, বড়খাতাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে।

ইটভাটায় যাওয়া শ্রমিকরা জানান, একটি কাঁচা ইট তৈরির কাজে সাধারণত তিনজন শ্রমিক প্রয়োজন হয়। একটি পরিবারের তিনজন সদস্য একসঙ্গে কাজ করলে দিনে প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় করা যায়। এ কারণে বাড়তি আয়ের আশায় অনেক শ্রমিক সন্তানদেরও ইটভাটায় নিয়ে যান।

শ্রমিক তৈয়ব আলী বলেন, ‘আমার সংসারে অভাব-অনটন। এ জন্য পরিবারের সবাইকে নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছি। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার দিন কি শেষ হয়ে গেল? ফিরে এসে আবার লেখাপড়া করবে।’

সিংগিমারী গ্রামের শ্রমিক সর্দার একরামুল হক বলেন, চুক্তির ভিত্তিতে একটি পরিবারকে ছয় মাস কাজের জন্য অগ্রিম ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী মিলে এই টাকা নিয়েছেন। ইটভাটায় কাজ করে তারা সেই টাকা পরিশোধ করবেন।

শ্রমিক সর্দারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর হাতীবান্ধা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ নরসিংদী, কুষ্টিয়া, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটায় কাজ করতে যান। এবারও অনেকে পরিবারসহ ইটভাটায় যাওয়া শুরু করেছেন।

হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম মিঠুল বলেন, ‘গত বছর অনেক শিক্ষার্থী আমাদের অজান্তে মা-বাবার সঙ্গে ইটভাটায় চলে গিয়েছিল। বিষয়টি জানার পর চলতি বছর অভিভাবক সমাবেশসহ বিভিন্নভাবে তাদের অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে সন্তানদের ইটভাটায় না নেন। এর পরও কিছু অভিভাবক আমাদের অনুরোধ রাখেননি। ইটভাটায় কাজে যাওয়া শিশুরা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে।’

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, বিষয়টি তিনি জেনেছেন। এরই মধ্যে বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের ইটভাটায় কাজে যাওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবছর এই সময়ে অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করা হয়, যাতে অভিভাবকরা সন্তানদের ইটভাটায় নিয়ে না যান।

আরও পড়ুন

×