পাহাড়-টিলা কেটে গড়ে উঠছে রিসোর্ট-কটেজ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
মৌলভীবাজারে পাহাড়-টিলা কেটে গড়ে উঠছে রিসোর্ট-কটেজ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য। ছবি- সমকাল
মৌলভীবাজার ও কমলগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:২৫ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:২৯
মৌলভীবাজারে পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল কেটে একের পর এক গড়ে উঠছে রিসোর্ট ও কটেজ। গত কয়েক বছরে জেলায় এ ধরনের স্থাপনার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের অনুমোদন ও বৈধতা সম্পর্কে সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই। শুরুতে নিয়ম মেনে কিছু রিসোর্ট গড়ে উঠলেও গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। কোথাও বাসাবাড়ি, কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে কয়েকটি কক্ষ তৈরি করেই সেগুলোকে রিসোর্ট হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
রিসোর্ট নির্মাণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলে। উঁচু টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে, গভীর বনের ভেতরে নির্মাণ করা হচ্ছে কটেজ ও অন্যান্য স্থাপনা। কোথাও গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও স্বাভাবিক চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, এভাবে বন ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হতে থাকলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, চলাচলের পথ ও খাদ্যের উৎস বিপন্ন হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জ উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লাউয়াছড়া এলাকায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর ভূমি নিয়ে ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। লাউয়াছড়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংরক্ষিত চিরহরিৎ বনাঞ্চল ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা। ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর ২০১৩ সালে শ্রীমঙ্গলে ১৩ একর জায়গাজুড়ে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ। এরপর ক্রমান্বয়ে পাহাড়-টিলা কেটে জেলাজুড়ে রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠতে থাকে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলে রয়েছে শতাধিক রিসোর্ট। শুধু শহরের রাধানগর এলাকাতেই রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টি। এসব স্থাপনা ও পর্যটকের সমাগম বাড়তে থাকায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বড় কোম্পানি, ধনাঢ্য ব্যক্তি, আইনজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা এমনকি জনপ্রিয় তারকারাও নামে-বেনামে এসব রিসোর্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। মূলধারার রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেকে স্থানীয়দের কাছ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন শতক জমি কিনে রিসোর্টের নামে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব জানান, চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে লাউয়াছড়া থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে এসেছে। এর মধ্যে অজগর, পদ্ম গোখরা, আইড ক্যাট স্নেক, সবুজ ফণিমনসা, গন্ধগোকুল, বানর ও মেছো বিড়াল বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তাদের মতে, নির্বিচারে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে ফেলা এবং প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের বিচরণ বেড়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী বনকে আর নিরাপদ মনে করছে না। এ কারণে প্রাণীগুলো বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য আ.স.ম. ছালেহ সোহেল বলেন, যেকোনো প্রাণীই নিরাপদ আবাসস্থল প্রত্যাশা করে। কিন্তু নির্বিচারে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে ফেলার কারণে বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থলকে আর নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলের আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিসোর্ট ও কটেজ। এসব স্থাপনায় ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম আলোর বিকিরণ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয় বিপন্ন হয়ে পড়ে।
ছালেহ সোহেলের ভাষ্য, রিসোর্টের সংখ্যা ১০ থেকে ২০টির মধ্যে থাকলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতো। কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছেছে। এ ছাড়া লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলে খাদ্যসংকটও রয়েছে। বন্যপ্রাণী সাধারণত নির্জন পরিবেশ পছন্দ করে। কিন্তু নির্জনতা নষ্ট হওয়া এবং নিরাপদ বিকল্প আবাসস্থল না থাকায় প্রাণীগুলো বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন জানান, শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১০৩টি রিসোর্ট রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বা অন্য কোথাও রিসোর্ট নির্মাণ করতে হলে জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। তবে তাঁর মতে, শ্রীমঙ্গলে পূর্ণাঙ্গ রিসোর্টের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টির বেশি হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীমঙ্গলের এক রিসোর্ট মালিক বলেন, মৌলভীবাজারের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের কথা বিবেচনা করেই গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন শ্রেণির রিসোর্ট ও কটেজ তৈরি হতে থাকে। তারা সরকারি আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে দাবি করেন। তবে বর্তমানে বেপরোয়াভাবে রিসোর্ট গড়ে ওঠায় এসব স্থাপনা কীভাবে এবং কার অনুমতি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে, তা তদারক করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রীমঙ্গলে প্রকৃত অর্থে রিসোর্টের সংখ্যা মাত্র ১০ থেকে ১৫টি। সরকারি নিয়ম মেনে কর দিয়ে যারা ব্যবসা করছেন, তারা নামসর্বস্ব এসব অবৈধ রিসোর্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম জানান, প্রায় ৫০টি রিসোর্ট পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে। যারা ছাড়পত্র নেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে। পাহাড় কেটে অনেকেই রিসোর্ট নির্মাণ করছেন। তবে আইনের ফাঁকফোকরের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাঈদুল ইসলাম বলেন, ২০টি বা তার বেশি কক্ষ রয়েছে এমন রিসোর্টকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হয়। ২০ কক্ষের কম হলে ছাড়পত্র নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, টিলা বা পাহাড় কাটার অভিযোগ পেলে প্রশাসন তা খতিয়ে দেখছে। শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে কতটি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, সেগুলোর জমির মালিকানা, অনুমোদন ও লাইসেন্সের অবস্থা কী এসব তথ্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ চলছে। জমি বা টিলার শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন না থাকলে তা করতে দেওয়া হচ্ছে না। সম্প্রতি নিয়ম অমান্য করায় দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা এ ধরনের পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রকৃতির ওপর এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষতি রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
- বিষয় :
- পাহাড়
- রিসোর্ট
- জীববৈচিত্র্য