ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

পদ্মায় বিলীন ২০০ ঘরবাড়ি

পদ্মায় বিলীন ২০০ ঘরবাড়ি
×
×

ভাঙনকবলিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়ের বাদশাপাড়া সমকাল

 চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক দশকে ৭০ বছর বয়সী মোস্তফা আলীর চারবার ভিটেমাটি গিলে খেয়েছে পদ্মা। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো মুক্তি মিলবে। তাই পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১৪ বিঘায় ফসল আর কষ্টার্জিত টাকায় তৈরি করা ইটের পাকা বাড়িতে প্রতিবন্ধী ছেলেসহ সাত সন্তান নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। সেই আশাও গুঁড়িয়ে দিল সর্বনাশা পদ্মা। 

রোববার দুপুরে নদীর তীরে বসে থাকতে দেখা যায় হতাশ মোস্তফা আলীকে। হাহাকার চেপে বলেন, ‘এমন ভাঙন জীবনে দেখিনি। চোখের পলকে ১৪ বিঘা জমি আর সাধের পাকা বাড়ি নদী গিলে খেল। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াব– আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। ’

শুধু মোস্তফা আলী একা নন; ভারতের ফারাক্কা বাঁধ থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় উজানের ঢল ও তীব্র ঘূর্ণিস্রোতে নদীতীরের হাজারো মানুষের এখন একই পরিণতি। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে চোখের পলকে বিলীন হয়েছে আধা কিলোমিটার এলাকা। 

সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জের নামো জগন্নাথপুর, ফিল্ডের হাট, বাদশাহপাড়া, বিশরশিয়া ও মনোহরপুরে চলছে প্রলয়ংকরী ভাঙন। প্রতিবছর বর্ষায় পানি বাড়ুক কিংবা কমুক; ভাঙনের শিকার হতে হয় এই জনপদের অবহেলিত মানুষকে। তবে এবার ভাঙনের তীব্রতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষণে ক্ষণে মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসছে ঘর সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর থেকে নদীভাঙন রোধে কোনো টেকসই বা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীর বুকে হারিয়ে যাচ্ছে। কেবল চলতি বছরেই সদর ও শিবগঞ্জের নদীতীরবর্তী এলাকায় ছয় শতাধিক বাড়িঘর এবং শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রচণ্ড ঝুঁকিতে রয়েছে 

বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিজিবি ক্যাম্প। ফারাক্কার একেবারে কাছে হওয়ায় শুধু দুর্লভপুরের বাদশাহপাড়া ও নামো জগন্নাথপুরেই গত পাঁচ দিনে ৫০ পরিবারের ২০০ বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভিটেমাটি হারানো এসব নিঃস্ব মানুষের অনেকে ফিল্ডের হাট এলাকার একটি বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে আবার অনেকে খোলা জায়গায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয় নেওয়া রাজমিস্ত্রি মেরাজুল ইসলাম তাঁর দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে জানান, তিন বিঘা জমিসহ বসতবাড়ি সবই নদী গিলে খেয়েছে। কৃষিজমি হারিয়ে পরিবার বাঁচাতে ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে ভবন থেকে পড়ে এখন তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী। তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠে ত্রিপল খাটিয়ে অবস্থান করছেন। দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে।
অন্যদিকে নামো জগন্নাথপুর ফিল্ড বাজার এলাকার বাসিন্দা রাজু আলীর কণ্ঠে ঝরে পড়ে চরম আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে কোনো ত্রাণ বা ভিক্ষা চাই না; টেকসই বাঁধ চাই। দাদার ১০০ বিঘা জমি সবই তো পদ্মার পেটে গেছে। আগে নিজেরা কামলা খাটিয়ে সংসার চালাতাম। আর এখন অন্যের জমিতে দিনমজুর খাটতে হচ্ছে।’

এলাকাবাসীর ক্ষোভ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রতি। বাদশাহপাড়ার রুবেল আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অবহেলিত এসব মানুষের পাশে কেউ নেই। অন্য বছর ভাঙন তীব্র হলে অন্তত নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। এবার তাও করা হচ্ছে না। পাউবোর এমন উদাসীনতায় ক্ষোভে ফুঁসছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
দুর্লভপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম আযম জানান, মনোহরপুর ফিল্টেরহাট, নামো জগন্নাথপুর এবং সাহেবেরহাট মিলিয়ে তাঁর ইউনিয়নের অন্তত চারটি এলাকায় ভাঙন চলছে। এসব এলাকার ৫০ পরিবারের বাড়ি বিলীন হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনকে ৪০টি পরিবারের তালিকা দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে তাদের সহায়তা করা হবে। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম জানান, বন্যার সময় সাধ্যমতো ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, তাদের পুনর্বাসনে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি দ্রুত লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ দপ্তরে জানানো হবে। নদী থেকে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ী বাঁধের কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
এদিকে নদীভাঙনের ভয়াবহতা স্বীকার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, ভাঙন প্রতিরোধে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে ৭৪৮ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়াও সম্পন্ন। তবে নদীতে পানির স্রোত বেশি থাকায় এখন কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। নদীর পানি কিছুটা কমলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলে টেকসই বাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করা হবে।
অস্থায়ী জিও ব্যাগের তালিকা দেওয়া লোক দেখানো কাজের বদলে ভিটেমাটি ও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দ্রুত স্থায়ী ও সুদৃঢ় নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানান পদ্মাপাড়ের অসহায় মানুষ।

আরও পড়ুন

×