সাতক্ষীরায় বস্তির ৭৫ শতাংশ পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৯ শতাংশের বেশি পরিবার গত ১২ মাসে সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পায়নি। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার।
অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র গ্রহণের পাঁচ বছর পরও বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য, পানি, আবাসন, শিক্ষা ও জীবিকার সংকট কাটেনি। সাতক্ষীরা শহরের ৩৫টি অনানুষ্ঠানিক বস্তির ৩৫৮টি পরিবারের ওপর খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি বাংলাদেশ পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে গতকাল বুধবার সাতক্ষীরায় আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় সংলাপে ‘ডিসপ্লেসড, ডিনায়েড’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি বাংলাদেশ, খানি সদস্য স্বদেশ সাতক্ষীরা এবং পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান) এ সংলাপের আয়োজন করে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘সহিষ্ণুতার শুরু নিজ ঘর থেকেই’।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারে কোনো না কোনো সদস্যকে খাবার কম খেতে হয়েছে বা বেলার খাবার বাদ দিতে হয়েছে। ৫২ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে পুরো এক দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। খাবার জোগাড় করতে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার উৎপাদনশীল সম্পদ বা প্রয়োজনীয় গৃহস্থালিসামগ্রী বিক্রি করেছে।
গবেষণাটি উপস্থাপন করেন প্রানের প্রোগ্রাম সমন্বয়ক উম্মে সালমা। তিনি জানান, সাতক্ষীরা পৌরসভার ৩৫টি বস্তির ৩৫৮টি পরিবারের এক হাজার ৩৪১ জন সদস্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পৌরসভার ৪৭টি অনানুষ্ঠানিক বস্তিতে প্রায় সাত হাজার ৫৭৩টি পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের বড় অংশ শ্যামনগর, আশাশুনিসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এসেছে।
খাদ্য সংকটের পাশাপাশি সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিও প্রকট। জরিপে দেখা গেছে, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার আংশিক বা পুরোপুরি লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত অগভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। গত এক মাসে জরিপভুক্ত অর্ধেক পরিবারের সদস্যদের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
আবাসনের অনিশ্চয়তাও রয়েছে। সরকারি জমিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ৫৯ শতাংশ উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়েছে। গত ১২ মাসে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পায়নি। সহায়তা না পেলে বা প্রয়োজন হলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, তা জানে না ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার।
শিক্ষা ও শিশুশ্রমের চিত্রও উদ্বেগজনক। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত নয়। এদের ৩০ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
সংলাপে বাস্তুচ্যুত পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সংকটের কথা তুলে ধরেন। ফাতেমা বেগম, সোনিয়া বেগম, সালমা, রিজিয়া বেগম, তন্বী খাতুন ও পারুল পারভিন জানান, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অনেকে ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। আয় অনিয়মিত, আর দৈনিক ২০০ টাকার মতো মজুরিতে সংসারের খরচ চালানো কঠিন। ফলে অনেক পরিবার সামান্য টাকার বিনিময়ে শিশুদের গ্যারেজে কাজে পাঠাচ্ছে। এসব শিশুর কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে বলেও তারা জানান। পরিবারের আয় কম হওয়ায় শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মইনুল ইসলাম মইন বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিবাসন একটি সাধারণ বিষয়। তবে বাস্তুচ্যুতি বলতে এমন স্থানান্তরকে বোঝানো হচ্ছে, যেখানে মানুষ স্বেচ্ছায় নয়, বরং বাধ্য হয়ে নিজের এলাকা ছেড়েছে।
মইনুল ইসলাম বলেন, বস্তিতে সবজি চাষের জমি নেই, পর্যাপ্ত পানি নেই, শোভন জীবনযাপনের সুযোগও সীমিত। পৌরসভাকে সঙ্গে নিয়ে রিসোর্স ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে কোন বস্তিতে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া সম্ভব হবে। বস্তি ব্যবস্থাপনায় পৌরসভার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব এখনও নির্ধারিত না থাকায় এ বিষয়ে নতুন করে ভূমিকা নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত বলেন, বস্তিতে বসবাসকারী যারা এখনও বয়স্ক বা বিধবা ভাতা পাচ্ছেন না, তাদের তালিকা দেওয়া হলে ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করার ওপরও জোর দেন তিনি।
- বিষয় :
- খাদ্য সংকট