শরীয়তপুরে এক মণ মটর ডালে ২০ ফুটের দুর্গাপ্রতিমা
ছবি- সমকাল
শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:০৭
মাটি, খড় আর রঙের প্রচলিত নির্মাণশৈলী ছাড়িয়ে এবার ব্যতিক্রমী এক আয়োজন। একের পর এক মটর ডাল সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে ২০ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা। এতে ব্যবহার করা হয়েছে অন্তত এক মণ মটর ডাল। তিন মাস ধরে ছয় শিল্পীর পরিশ্রম ও নিপুণ হাতে ফুটে উঠেছে প্রতিমার অবয়ব ও নান্দনিক কারুকাজ।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের ঘোষপাড়া শ্রী রাধাগোবিন্দ ধাম দুর্গামন্দিরে তৈরি করা হয়েছে ব্যতিক্রমী এ প্রতিমা। প্রতিমার শরীরজুড়ে মটর ডালের সুনিপুণ বিন্যাস ও নকশা ঘিরে ভক্ত-দর্শনার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি কৌতূহল।
প্রতিবছর প্রতিমা নির্মাণে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করে মন্দির কর্তৃপক্ষ। এর ধারাবাহিকতায় গত বছর ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। এবার সেই জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে মটর ডাল।
বাঁশ, কাঠ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি কাঠামোর ওপর একটির পর একটি মটর ডাল বসিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ২০ ফুট উচ্চতার প্রতিমা। প্রতিটি অংশের নকশা ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখতে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করেছেন শিল্পীরা। ডাল বসানোর কাজ শেষ করে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা।
সাধারণত মাটি, রং ও তুলির আঁচড়ে প্রতিমার অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা। কিন্তু মটর ডালের মতো উপকরণ দিয়ে এত বড় প্রতিমা নির্মাণে প্রয়োজন হয়েছে বাড়তি ধৈর্য, শ্রম ও নিপুণতার। একটি ডালও যথাস্থানে ঠিকভাবে না বসলে নষ্ট হতে পারে নকশার সৌন্দর্য। তাই প্রতিটি ধাপে সতর্ক থাকতে হয়েছে শিল্পীদের।
এ বছর শরীয়তপুর জেলায় ১০২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। পূজা ঘিরে জেলার মণ্ডপগুলোতে প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিমাটি দেখতে মন্দিরে আসছেন দর্শনার্থীরা। অভিনব উপকরণের পাশাপাশি এর কারুকাজও তাঁদের আকৃষ্ট করছে।
প্রতিমা দেখতে আসা দর্শনার্থী রবিন শিল বলেন, এই মন্দিরে প্রতিবছরই প্রতিমা তৈরিতে নতুনত্ব রাখার চেষ্টা করা হয়। এবার মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে, যা সত্যিই ব্যতিক্রমী। প্রতিমার কারুকাজ খুব সুন্দর হয়েছে।
আরেক দর্শনার্থী বিদ্যা চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবছর এই মন্দিরে কিছু নতুনত্ব দেখা যায় যা আমাদের অন্যরকম ভাবে আকৃষ্ট করে। এবারের আয়োজনটা সত্যি খুব সুন্দর হয়েছে।
খুলনার পাইকগাছা থেকে আসা প্রধান প্রতিমাশিল্পী রাজিব সরদার গত পাঁচ বছর ধরে এ মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এবারই প্রথম মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
রাজিব সরদার বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। সাধারণত মাটি, রং আর তুলির আঁচড়ে প্রতিমাকে ফুটিয়ে তুলি। তবে এবার দর্শনার্থীদের জন্য নতুন কিছু করার ভাবনা থেকেই মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। কাজটি বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ছিল। প্রতিটি ডাল যত্ন করে বসাতে হচ্ছে, যাতে প্রতিমার সৌন্দর্য ও নিখুঁত কারুকাজ বজায় থাকে। প্রায় তিন মাস ধরে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে এবং দেশজুড়ে আলাদা পরিচিতি পাবে।
নির্মাণ শিল্পী বিধান মণ্ডল বলেন, মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজটি খুবই ধৈর্য ও নিপুণতার। একটি একটি করে ডাল প্রতিমার গায়ে বসাতে হয়। কোনো ডাল সরে গেলে বা ঠিকমতো না বসলে আবার সেটি ঠিক করতে হয়। এতে অনেক সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে। আমরা দিনরাত পরিশ্রম করেছি, যাতে প্রতিমার প্রতিটি অংশ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। কাজটি কষ্টসাধ্য হলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিমার সৌন্দর্য দেখে আমাদের সব পরিশ্রম সার্থক।
মন্দির কমিটির সভাপতি লালা ঘোষ বলেন, আমরা প্রতি বছরই আমাদের মন্দিরে ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করি। গত বছর ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। এবার সেই ধারাবাহিকতায় মটর ডাল দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে অন্তত এক মণ ডাল লাগছে। প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জা মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
- বিষয় :
- দুর্গাপূজা
- প্রতিমা