দেশি বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে আনন্দের চেয়ে আক্ষেপই বেশি রবিনের
ছবি: সমকাল
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:০৭
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌর শহরের ব্যস্ততম ননী গোপাল মোড়ের ছোট্ট একটি দোকান নাম ‘স্বপন তবলা ঘর’। দোকানটিতে থরে থরে সাজিয়ে রাখা তবলা, ডুগি, ঢোল, করতাল আর দোতারা। এক সময় যেসব বাদ্যযন্ত্রের সুরে গ্রামবাংলার মেলা, যাত্রাপালা, কীর্তন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের আসর জমে উঠত, সেগুলো এখন এখানে অনেকটা নীরব।
দোকানের মালিক রবিন দাস। চার পুরুষ ধরে তাঁর পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু দোকানের তাকজুড়ে সাজানো বাদ্যযন্ত্রগুলোর দিকে তাকালে এখন আনন্দের চেয়ে আক্ষেপ বেশি ধরা পড়ে তাঁর চোখেমুখে।
সময় বদলেছে। মানুষের বিনোদনের ধরন বদলেছে। বিয়েবাড়ি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এখন অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্র আর ডিজিটাল কিবোর্ড, অর্কেস্ট্রা ও ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের দাপট। হাতে তৈরি তবলা, ঢোল কিংবা দোতারার সেই আগের চাহিদা নেই। আর তার সঙ্গে কমে গেছে এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরদের কাজও।
কথা হয় রবিন দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর বাবার দাদুই এই কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে দাদু, দাদুর কাছ থেকে বাবা এবং বাবা ও দাদুর কাছ থেকে তিনি শিখেছেন বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের কাজ। ছোটবেলা থেকে দোকান আর বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর বেড়ে ওঠা।
তিনি বলেন, ‘একসময় আমাদের দোকানের বেশ পরিচিতি ছিল। ফুলবাড়ী ছাড়াও আশপাশের উপজেলা, এমনকি দূরের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ বাদ্যযন্ত্র কিনতে আসতেন। তবলা, ডুগি, ঢোল, করতাল আর দোতারার ভালো চাহিদা ছিল। এখন সেই জৌলুস নেই।’
দাদার মৃত্যুর পরে বাবা এ পেশায় ছিলেন। এরপর বাবার মৃত্যুর পরও পেশাটি আঁকড়ে আছেন তিনি। কিন্তু আগের মতো বিক্রি নেই। দোকানে তৈরি করে রাখা বাদ্যযন্ত্র অনেক সময় মাসের পর মাস পড়ে থাকে। দোকানের একটি তবলার ওপর হাত রেখে রবিন বলছিলেন, আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সামনে রেখে মানুষ এসে তবলা, ঢোল কিংবা দোতারা কিনতেন। পালাগান, কীর্তন, বাউল আসর কিংবা গ্রামীণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব বাদ্যযন্ত্রের ছিল আলাদা মর্যাদা। এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সহজলভ্যতায় সেই জায়গাটি অনেকটা সংকুচিত হয়েছে। সব জায়গায় এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। বিয়ে, গ্রামীণ যাত্রাপালা, সবখানে কিবোর্ড, অর্কেস্ট্রা আর ডিজিটাল সাউন্ড। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সুর এখন আর তেমন কেউ শুনতে চায় না, তেমন কিনতেও চায় না। হাতেগোনা কিছু লোক এই বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেন।
কথার এক পর্যায়ে রবিনের কণ্ঠে জমে ওঠে অন্যরকম আক্ষেপ। চার পুরুষ ধরে চলে আসা এই পেশা তাঁর পরে থেমে যেতে পারে। ছেলেমেয়েদের এই পেশায় আনবেন কিনা, জানতে চাইলে রবিন বলেন, ‘না। তাদের পড়ালেখা শিখিয়ে চাকরি-বাকরি করতে দেব। এই কাজ করে এখন আর সংসার চালানো কঠিন।’
শুধু রবিন দাসের দোকান নয়, ফুলবাড়ীর পৌর বাজারের ‘দাস মিউজিক্যালস’-এর কর্ণধার ও সংগীত শিক্ষক প্রবীর কুমার দাস বাবুও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান।
তাঁর মতে, হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্রের বাজার সংকুচিত হওয়ার পেছনে আধুনিক প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে। এখন ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ও অর্কেস্ট্রা সহজে পাওয়া যায়। ফলে অনুষ্ঠানের আয়োজকরা আগের মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ওপর নির্ভর করছেন না।
প্রবীর কুমার দাস বলেন, কারিগর রেখে হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে বিক্রি করেও এখন তেমন লাভ হয় না। তাই দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি তাঁর দোকানে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ও ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্র।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শুধু একটি ব্যবসা নয়, হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি কারিগরি জ্ঞানও। একটি তবলা কীভাবে তৈরি হবে, ঢোলের কাঠামো কেমন হবে, চামড়ার টান কতটা রাখতে হবে কিংবা দোতারার সুর ঠিক করতে কী করতে হয়, এসব অভিজ্ঞতা বই পড়ে শেখা যায় না। এগুলো তৈরি হয় দীর্ঘদিনের হাতেকলমে কাজের মধ্য দিয়ে। ‘স্বপন তবলা ঘর’-এর নীরব তাকগুলো তাই কেবল কয়েকটি পুরোনো বাদ্যযন্ত্রের গল্প বলে না, বলে একটি বদলে যাওয়া সময়ের গল্পও।
- বিষয় :
- ফুলবাড়ী
- দিনাজপুর
- বাদ্যযন্ত্র