বিহঙ্গ
সাদা-কালো থিতধরা মাছরাঙা
রাজশাহীর মোহনপুরের চুলকানি বিলে যাওয়ার পথে একটি থিতধরা মাছরাঙা লেখক
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুর্লভ ও বিরল পাখির প্রজনন প্রতিবেশ নিয়ে গবেষণার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে ঘুরতে ২০১৭ সালের ১৪ জুলাই ভোরে রাজশাহী পৌঁছলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী হাউসে ব্যাগপত্র রেখে নাশতা সারলাম। এর পর ভাগনে সাদমানকে নিয়ে সিমলা পার্কের দিকে এগোলাম। ওখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন আলোকচিত্রী কায়েস ও আকাশ। চারজনে মিলে প্রায় দুই ঘণ্টা ঘুরে কালোমাথা ও তিনরঙা মুনিয়ার প্রচুর ছবি তুললাম।
এর পর সবাই পুলিশ লাইন্সের পাশে বটতলা ঘাটে গেলাম পদ্মা নদীতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। নুরু মাঝিকে নিয়ে ওখানে অপেক্ষা করছিলেন আরেক আলোকচিত্রী মারুফ রানা। প্রচণ্ড বাতাসের কারণে পদ্মায় পাখি দেখার ইচ্ছা ত্যাগ করতে হলো। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, জেলখানা এলাকায় শামুকখোলের বিশাল কলোনি দেখে দুপুরের খাবার সারব। তারপর মোহনপুরের চুলকানি বিলে যাব। বিলের পানি এতটাই খারাপ, গায়ে লাগলেই চুলকায়। তাই গ্রামবাসী এমন নাম দিয়েছেন।
দুপুরের খাবার সেরে দুবার অটো বদলে মোহনপুর বিলে যাওয়ার মেঠোপথে নামলাম। ওখান থেকে আধা কিলোমিটার হাঁটলে বিল। গ্রামীণ মেঠোপথের একপাশে সরু খাল ও অন্য পাশে ফসলের ক্ষেত। মেঠোপথের শুরুতেই দেখা হয়ে গেল লম্বালেজি কসাই পাখির সঙ্গে। এর পর নীল-লেজ সুঁইচোরা ও শালিকের ছানা।
হঠাৎ দেখলাম লম্বা কালো ছুরির মতো ঠোঁট নিচের দিকে তাক করে খালের ওপর শূন্যে স্থির হয়ে হোভারিং করছে এক সাদা-কালো পাখি। টার্গেট নিশ্চয়ই পুঁটিমাছ। সময়মতো জেট বিমানের মতো নিচে নেমে শিকার মুখে পুরে ফিরে আসবে।
সাদা-কালো পাখিটি আর কেউ নয়, এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি থিতধরা মাছরাঙা। পাকড়া, সাদা বা ডোরাকাটা মাছরাঙা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে কড়িকাটা বা চিতেফাটকা মাছরাঙা। বেশির ভাগ মানুষই এদের পাকড়া মাছরাঙা নামে ডাকে। শূন্যে স্থির হয়ে থাকে বলে বেশ কিছু অঞ্চলে এটিকে থিতধরা মাছরাঙা বলে।
ইংরেজি নাম Pied/Lesser Pied/Smaller Pied Kingfisher, বৈজ্ঞানিক নাম Ceryle rudis (সেরিল রুডিস)। মালদ্বীপ বাদে ভারতীয় উপমহাদেশের সব দেশ, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়ার অন্য অনেক দেশ ও আফ্রিকায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য ২৫-৩১ ও প্রসারিত ডানা ৪৫-৪৭ সেন্টিমিটার। ওজনে পুরুষ ৬৮-১০০ গ্রাম ও স্ত্রী ৭১-১১০ গ্রাম। দেহের সাদা জমিনের ওপর কালো দাগ ও ফোঁটা থাকে। উড়ন্ত অবস্থায় দেহের রং খোলে। ডানায় সাদা-কালোর চমৎকার কারুকাজ। মাথার খোঁপা কালো। ঘাড় থেকে একটি চওড়া কালো টান চোখের নিচ হয়ে চঞ্চুর আগা পর্যন্ত চলে গেছে। গলার নিচ সাদা; তাতে দু-চারটি কালো ছোট ছোপ রয়েছে। লেজের আগা সাদা; নিচের কিছুটা অংশ কালচে। পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে একই রকম হলেও পুরুষের বুকে দুটি কালো দাগ রয়েছে; স্ত্রীর ক্ষেত্রে দাগটি অসম্পূর্ণ। চোখ বাদামি। ঠোঁট মোটা, শক্ত ও ধূসর-কালো। পা, পায়ের পাতা ও নখও ধূসর-কালো।
থিতধরা মাছরাঙা সচরাচর জোড়ায় থাকে। নদী-নালা, খালবিল, পুকুর, এমনকি ছোটখাটো জলাধার; যেখানেই খাদ্য থাকার সম্ভাবনা আছে, সেখানেই ঘোরাফেরা করে। মূলত মাছখেকো হলেও ব্যাঙাচি ও জলজ পোকামাকড়ও খায়। সচরাচর ‘চিররিক-চিররিক-চিররিক ...’ শব্দে ডাকে। উড়ন্ত অবস্থায় বেশি ডাকে।
ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল প্রজননকাল হলেও সারাবছরই ডিম-ছানা তোলে। বাসা বানায় ডোবা-নালা-খাল-নদীর খাড়া পাড়ের দেয়ালে। বাসার স্থান নির্বাচনে বেশ বুদ্ধির পরিচয় দেয়। খাড়া দেয়ালের এমন স্থানে গর্ত করে, যেখানে সাপ-গুইসাপ বেয়ে উঠতে পারে না। গর্তের মুখ ছোট ও গভীরতা বেশি থাকায় শিকারি পাখিরা ডিম-ছানার ক্ষতি করতে পারে না। স্ত্রী পাখি গর্তের শেষ মাথায় পাঁচ-সাতটি সাদা ডিম পাড়ে। ফোটে ১৯-২২ দিনে। ছানারা উড়তে শেখে ১৩-১৬ দিন পরে। আয়ুষ্কাল চার-পাঁচ বছর।
লেখক : পাখি, বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- বিহঙ্গ