ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

খাসজমি দখল, বহমান খালের গতিরোধ করে সীমানা প্রাচীর

খাসজমি দখল, বহমান খালের গতিরোধ করে সীমানা প্রাচীর
×
×

ভদ্রাবতী খালের জমিতে গড়ে তোলা নারিশ এগ্রোর সীমানা প্রাচীর। সম্প্রতি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বিশালপুর ইউনিয়নের মান্দাইল এলাকায় সমকাল

এস এম কাওসার, বগুড়া

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি খাসজমি দখল, বহমান খালের গতিপথ রোধ এবং গ্রামীণ সড়ক অবরুদ্ধ করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে ‘নারিশ এগ্রো লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় সরকারি নির্দেশ ও উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তার লাল নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ফসলের মাঠে যাওয়ার একমাত্র পথটি বন্ধ হয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় শত শত কৃষক।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় ভূমি অফিস মেপে অবৈধ দখল চিহ্নিত করার পর ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সীমানা প্রাচীর অপসারণের চূড়ান্ত নির্দেশ দিলেও তা মানেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। উল্টো এলজিইডির সড়ক দখল করে বিশাল গেট নির্মাণ এবং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলার জন্য পাইপ বসানো হয়েছে।

কৃষক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশালপুর ইউনিয়নের মান্দাইল এলাকায় ভদ্রাবতী খালটি কয়েক বছর আগে সরকারি উদ্যোগে পুনর্খনন করা হয়। পানি দিয়ে স্থানীয় কৃষকরা জমিতে সেচ দেওয়ার সুযোগ পান এবং খালের দুই পাশে বন বিভাগের লাগানো গাছ খালের পাড় মজবুত করে। গত এক বছর ধরে নারিশ এগ্রো লিমিটেড তাদের পোলট্রি ও হ্যাচারি মিলের স্থাপনা করা শুরু করলে বিপত্তি দেখা দেয়। মিলের পূর্বপাশে ভদ্রাবতী খালের প্রায় ৩০ শতাংশ সরকারি জমি ভরাট করে তারা পাকা সীমানা প্রাচীর তুলে ফেলে। প্রাচীর তোলার কারণে খালের পাড় দিয়ে কৃষকদের যাতায়াতের দীর্ঘদিনের রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বন বিভাগের বনায়নের ফলক সরিয়ে ১০ ফুট দূরে বসানো হয়েছে। বিপুল পরিমাণ গাছ কাটার পর কিছু গাছ প্রাচীরের ভেতরে বন্দি করা হয়েছে।

মান্দাইল গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক আনোয়ার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা ভদ্রাবতী খালের পানি দিয়ে চাষ করি আর পাড়ের রাস্তা দিয়ে হাটে-মাঠে যাই। নারিশ কোম্পানি দুই মাস আগে খাল ও রাস্তা দুইটাই দখল কইরা প্রাচীর দিছে। এহন জমিতে যাওয়ার পথ নাই, খালও সোজা থাইকা চিকন হয়া গেছে। আমরা অবিলম্বে এই অবৈধ প্রাচীর ভাইঙা ফেলার দাবি জানাই।’
সরেজমিনে দেখা যায়, এলজিইডির পাকা রাস্তার পাশের গাছ রাতের আঁধারে কেটে সেখানে কারখানার প্রধান ফটক নির্মাণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে হ্যাচারি ও ফিড মিলের ক্ষতিকর বর্জ্য বিমুক্ত করার জন্য সরাসরি খাল পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে, যা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকির কারণ হতে পারে।
খাল ও খাসজমি দখলের সত্যতা পেয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর বিশালপুর ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা ফেরদৌস জামান শহীদ ৭ দিনের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে নারিশ এগ্রোকে নোটিশ পাঠায়। নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়, সরকারি খাসজমি বা জলাশয় অবৈধভাবে দখল, ভরাট কিংবা স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই অবিলম্বে নিজ খরচে ও দায়িত্বে ওই বাউন্ডারি অপসারণ করে খাসজমি খালি করতে বলা হয়।

নোটিশের মেয়াদ শেষ হলেও প্রাচীর না ভাঙার কথা স্বীকার করে উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফেরদৌস জামান শহীদ বলেন, ‘নোটিশ পাওয়ার পরও তারা অবৈধ বাউন্ডারি সরায়নি। তারা স্পষ্টত দেশের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করছে। এখন আমরা নিজস্ব উদ্যোগে পরিমাপ করে সরকারি জমি দখলমুক্ত 
করার ব্যবস্থা নেব।’
তবে দখল ও অনিয়মের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নারিশ ফিড কোম্পানির মান্দাইল কারখানার ইনচার্জ সাধন বিশ্বাস। তিনি দাবি করেন, ২০১৭ সালে কোম্পানি এখানে ১০ একর জমি কিনেছে। তারা নিজেদের কেনা জমির ওপরই সীমানা প্রাচীর দিয়েছেন, খাল বা এলজিইডির কোনো সরকারি জায়গা দখল করা হয়নি।
বনায়ন ধ্বংসের বিষয়ে শেরপুর উপজেলা বন কর্মকর্তা (রেঞ্জার) তোফাজ্জল হোসেন জানান, বনায়ন ধ্বংস ও গাছ কেটে প্রাচীর দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউএনও সাইদুজ্জামান হিমু জানান, নারিশ কোম্পানি সরকারি খাসজমি ও খাল দখল করে প্রাচীর দেওয়ায় ইতোমধ্যে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা স্বেচ্ছায় প্রাচীর অপসারণ না করায় এখন আইনি প্রক্রিয়ায় উচ্ছেদ ও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×