প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষের বিরোধে শিক্ষার পরিবেশ হারাচ্ছে কলেজ
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মির্জাপুরে নতুন কহেলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার নাসির উদ্দিন বাবলু ও অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন ফারুকের মধ্যে বিরোধে শিক্ষার পরিবেশ হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাদের পরস্পরবিরোধী অভিযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা।
জানা গেছে, শিক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত নাসির উদ্দিন বাবলুর শ্বশুরবাড়ির এলাকা মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের নতুন কহেলা গ্রামে। এখানে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা হয় নতুন কহেলা কলেজ। ২০০৩ সালে শুরু হয় পাঠদান। ওই সময় অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান ঈমাম হোসেন ফারুক। তাঁর বাড়ি মাগুরা জেলায়। ২০০৪ সালে কারিগরি শাখা এবং ২০১৭ সালে সাধারণ শাখা এমপিওভুক্ত হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ জেনারেল শাখায় নিয়োগ পেলেও ২০০৪ সালে কারিগরি শাখায় এমপিওভুক্ত হয়ে বেতন নেন ২০১০ সাল পর্যন্ত। এই ঘটনা জানাজানি হলে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পান কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে উত্তরার একটি কলেজে যোগদান করেন। সেখান থেকে প্রায় আট মাস পর ফিরে এসে নতুন কহেলা কলেজে যোগদান করেন। এ নিয়ে অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন ফারুক এবং প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার নাসির উদ্দিনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এরই মধ্যে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কলেজের ৪০টি গাছ কাটা এবং পুরোনো টিনশেড ঘর একক সিদ্ধান্তে বিক্রির অভিযোগে আদালতে মামলা করেন নাসির উদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর শিক্ষকদের একটি অংশ ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন ফারুকের কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে গত দুই বছর তিনি কলেজে না গেলেও বেতন পাচ্ছেন নিযমিত এবং কলেজের অনেক কিছুই এখনও তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চলতি বছর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির ক্ষেত্রেও অধ্যক্ষের অনুপস্থিতির কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয় ভর্তি কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্তদের।
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার ও অধ্যক্ষের বিরোধে শিক্ষার পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। এইচএসসির ফলাফলও আগের চেয়ে অনেক নিম্নমুখী হয়েছে। আগে যেখানে ওই কলেজ থেকে শতকরা ৯০ বা এর বেশি পাস করেছে, সেখানে গত বছর পাস করেছে শতকরা ৬১ জন এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে মাত্র একজন। গত বছর সাধারণ শাখার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় ৮৬ জন শিক্ষার্থী, এ বছর ভর্তি হয়েছে ৭১ জন। কারিগরি শাখার একাদশ শ্রেণিতে গত বছর ভর্তি হয় ৭১ জন, এ বছর ভর্তি হয়েছে ৬২ জন। কৃষি ডিপ্লোমা শাখায় গত বছর ভর্তি হয় ৬৫ জন, এ বছর ভর্তি হয়েছে ৭ জন। শিক্ষকদের জবাবদিহি করার মতো কোনো জায়গা নেই। তাদের মধ্যে গা-ছাড়া মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এদিকে নাসির উদ্দিন বিভিন্ন সময় কলেজের তহবিল থেকে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৩০০ টাকা কোনো রেজুলেশন ছাড়াই নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন ফারুক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, প্রতিষ্ঠানের কথা চিন্তা না করে প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ একে অন্যকে দোষারোপ করে নানা রকম কাজ করে যাচ্ছেন।
অভিযোগের ব্যাপারে নাসির উদ্দিনের ভাষ্য, কলেজের জন্য ২৬ শতাংশ জমি ক্রয় বাবদ এই টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে কলেজের নামে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘ঈমাম হোসেন ফারুক স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে কীভাবে আবার এই কলেজে এলেন? কলেজে না এসে অবৈধভাবে দুই বছর ধরে বেতন নিচ্ছেন। আমরা এর বিচার চাই।’
অধ্যক্ষ ঈমাম হোসেন ফারুকের ভাষ্য, নাসির উদ্দিন নিজেকে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবি করেন, তবে নির্বাহী প্রধান বা নীতিনির্ধারক নন। মব সৃষ্টি করে দুই বছর ধরে তাঁকে কলেজে যেতে দিচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি কলেজের বাইরে থাকায় নাসির উদ্দিন অবৈধভাবে কলেজ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছেন। তা ছাড়া নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যম মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার বলেন, মামলার কারণে বিষয়টি বেশি জটিল আকার ধারণ করেছে। তবু প্রশাসন থেকে কলেজটির সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইউএনও জহিরুল আলমের ভাষ্য, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার নাসির উদ্দিন মামলা করেছেন। মামলা নিষ্পত্তি হলে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
- বিষয় :
- কলেজ