অন্য জমির ডিক্রিতে খেলার মাঠ দখল জামায়াত নেতার, ট্রাক্টর দিয়ে খুঁড়ে চাষাবাদ
খেলার মাঠ দখল করে প্রায় চার বিঘা জমি ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদ করা হয়। ছবি: সমকাল
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:১৯ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:২৪
অন্য জমির বিষয়ে আদালতের ডিক্রি দেখিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় খেলার মাঠ দখল করে চাষাবাদের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। প্রায় চার বিঘা জমি ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মাঠটি দখলমুক্ত করার দাবিতে সম্প্রতি বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। পরে প্রশাসনের তদন্তে জমিটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
শনিবার মাঠটি শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ ইউনিয়নের নওকৈড় গ্রামের সরকারি খাসজমি এতদিন এলাকার শিশু-কিশোররা খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করত। সেই মাঠ নিজের সম্পত্তি দাবি করে দখলে নেন স্থানীয় জামায়াত নেতা হেকমত আলী সরকার ও তার স্বজনরা। প্রায় চার বিঘা জমি ট্রাক্টর দিয়ে খুঁড়ে চাষাবাদ শুরু করেন তারা।
অভিযোগের ভিত্তিতে দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে জমির কাগজপত্র যাচাই করেন উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম।
পরে তিনি বলেন, হেকমত আলী যে জমির বিষয়ে আদালতের ডিক্রি দেখিয়েছেন, সেটি এই মাঠের জমি নয়। মাঠটি ৭৫৬ নম্বর দাগের সরকারি সম্পত্তি। আদালতের রায় দেখিয়ে অন্য দাগের জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। সরকার সেখানে কোনো প্রকল্প গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্থানীয় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় বাধা নেই। সরকারি জমি দখলের চেষ্টা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা যায়, ২০১৯ সালে সলপ ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শওকত ওসমান ভূমিহীনদের জন্য গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের উদ্দেশ্যে ওই খাসজমিতে মাটি ভরাট করেন। তবে গুচ্ছগ্রাম নির্মিত হয়নি। পরে জায়গাটি স্থানীয়দের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। নওকৈড় গ্রামের এই জমিতে শিশু-কিশোর ও তরুণেরা ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলা করে আসছিল।
অভিযোগ রয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে পরদিন শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হেকমত আলী সরকার ও তার পরিবারের সদস্যরা ট্রাক্টর দিয়ে মাঠটি চাষ করেন। এ ঘটনায় গত শুক্রবার শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী মাঠটি দখলমুক্ত করে খেলাধুলার জন্য সংরক্ষণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
সলপ ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল হোসেন বলেন, জমিটি এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। সরকারি নির্দেশনায় সেখানে গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের জন্য মাটি ভরাট করা হয়েছিল। সেটি না হওয়ায় পরে গ্রামের ছেলেমেয়েরা জায়গাটিতে খেলাধুলা করত।
স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী নাজমুল হুদা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিশুরা মাঠটিতে খেলাধুলা করে আসছিল। হঠাৎ ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদ শুরু হওয়ায় এলাকাবাসী বিস্মিত হন। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করতে মাঠটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তবে জমিটি নিজেদের বলে দাবি করেছেন হেকমত আলী সরকার।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক চেয়ারম্যান শওকত ওসমান তাদের জমি দখল করে মাটি ভরাট করেছিলেন। সম্প্রতি জমিসংক্রান্ত মামলায় তারা আদালতের ডিক্রি পেয়েছেন। তার অভিযোগ, স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী নাজমুল হুদার প্ররোচনায় তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। জমিটির হালনাগাদ খাজনা-খারিজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে।
উল্লাপাড়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মোহাম্মদ শাহজাহান আলী বলেন, তার জানা মতে জায়গাটি খেলার মাঠ নয়। সেখানে সরকারি জমির পাশাপাশি লিজ নিয়ে চাষাবাদের ঘটনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে কাগজপত্র আছে বলেও দাবি করেন তিনি।
গুচ্ছগ্রাম নির্মাণকে কেন্দ্র করে আগে বিরোধ ও মামলা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, মামলাটি বর্তমানে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সলপ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জমিটিকে সরকারি সম্পত্তি বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের আওতায় সেখানে মাটি ভরাট করা হয়েছিল। পরে জায়গাটি শিশু-কিশোর ও তরুণেরা খেলাধুলার জন্য ব্যবহার করত।
জেলা জামায়াতের মুখপাত্র মাওলানা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, নওকৈড় গ্রামে সরকারি সম্পত্তি রয়েছে। সেখানে বৈধ বা অবৈধ দখলদার আছে কিনা, তা প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত। হেকমত আলীর করা ‘এখন আমাদের সময় এসেছে’ মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি তার ব্যক্তিগত বক্তব্য, দলের নয়। এ ধরনের বক্তব্য দল সমর্থন করে না বলেও দাবি করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি জমিতে শিশুদের খেলার মাঠ থাকলে সেটি উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
- বিষয় :
- জমি দখল
- সিরাজগঞ্জ
- উল্লাপাড়া
- জামায়াত নেতা