‘প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট জেলে থাকা নাগরিকদের খোঁজ নেয়, অথচ আমাদের নেয় না’
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড
নজরুল ইসলাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:১২
‘কারাগারে থাকার সময় ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কিনা। সে জানিয়েছে, কেউ যোগাযোগ করেনি। প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট কারাগারে থাকা নাগরিকদের খোঁজ নেয়। অথচ আমাদের দেশের কনস্যুলেট তার কোনো খোঁজ নেয়নি। আমার ছেলেকে যে অভিযোগে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনজীবী পেয়েছিল কিনা, কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছিল কিনা, তাও বড় প্রশ্ন। আমার ছেলের মতো আর কারও যেন এমন পরিণতি না হয়।’
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলামের বাবা আবদুল বাছির কথাগুলো বলছিলেন। ছেলের মৃত্যুর খবরে শোকে স্তব্ধ এই বাবা এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাচ্ছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় গত ১৪ অক্টোবর। পরিবারের অভিযোগ, তাদের বা বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে না জানিয়েই এ দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর থেকে তারা বিষয়টি জানতে পারেন।
নজরুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন বাবা-মা। স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাঁদের সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করছেন। ছেলের মৃত্যুর খবর সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। পরিবারটির শোক এখন পুরো গ্রামেই ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় নজরুল এসএসসি পাসের পর পরিবারের হাল ধরতে ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যান। সেখানে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে সাত-আট মাস পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। পরে কারাগার থেকে ফোন করে নজরুল জানান, তিনি বন্দি। তবে কী অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়েছে, তা পরিবারকে জানাননি। প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, ‘ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠাতে ২০২২ সালে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলাম। যাওয়ার এক মাস পরই সে মক্কায় কাজ পায়। কিন্তু সাত-আট মাস পর থেকে তার খোঁজ পাচ্ছিলাম না। আটকের প্রায় দেড় মাস পর কারাগার থেকে ফোন করে সে বন্দি থাকার কথা জানায়। কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, তা সে বলেনি, আমরাও জানি না।’
তিনি বলেন, ‘গত রোববার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়। সে জানিয়েছিল, সমস্যার মধ্যে আছে। এরপর বুধবার শুনলাম, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে আমার বোনও মারা গেছে। ছেলে গেল, বোনও গেল—সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। ঋণের বোঝাও রয়ে গেছে। সরকারের কাছে দাবি, আমার ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।’
নজরুলের পরিবার জানতে চায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তিনি আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কিনা এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেট তাঁর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল কিনা। একই সঙ্গে সৌদি আরবে আটক অন্য বাংলাদেশিদের খোঁজখবর রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পরিবারটি।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
- বিষয় :
- সৌদি আরব
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া
- মৃত্যুদণ্ড