আদরের বিড়াল যখন আতঙ্কের কারণ
তাজনুর রহমান, শৈলকুপা (ঝিনাইদহ)
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
নিজ বিছানায় গভীর ঘুমে ছিলেন মিলন বিশ্বাস। হঠাৎই ওপর থেকে তাঁর মাথায় আছড়ে পড়ে একটি বিড়াল। হুড়মুড়িয়ে ওঠার মধ্যেই বিড়ালের নখের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় মিলনের মাথা। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাতলাগাড়ি গ্রামের এই বাসিন্দা গত রোববার এসেছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জলাতঙ্কের টিকা নেওয়া। টিকা নিয়েই বাড়ি ফেরেন তিনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। আগের মাসগুলোতে এমন দেখা
যায়নি। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের ইপিআই বিভাগের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন এত পরিমাণ মানুষ জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে আসছেন, যা কল্পনার বাইরে। সাম্প্রতিক সময়ে দিনে কখনও এই সংখ্যা একশও ছাড়িয়ে যায়। এদের বেশির ভাগই বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে আসছেন। আক্রমণকারী প্রাণীর তালিকায় রয়েছে কুকুর, শিয়াল, ঘোড়া, এমনকি ইঁদুরও। এত পরিমাণ জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সংগ্রহে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
গত রোববার টিকা নিতে এসেছিলেন কাঁচেরকোল গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মঈন। অনার্সপড়ুয়া এই তরুণের পোষা একটি বিড়াল আছে। আদরের সেই বিড়ালই অসাবধানে তাঁকে কামড় দেয়। দামুকদিয়া গ্রামের মাহিমা খাতুন এসেছিলেন দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে। শিশুকেও আঁচড় দিয়েছে বিড়াল।
বারইপাড়া গ্রাম থেকে ৮ বছরের মেয়েকে নিয়ে আসা গৃহবধূ দিলরুবা বলেন, মেয়েকে বিড়াল কামড়েছে। সেই সঙ্গে আঁচড়ও দিয়েছে। এ জন্য জলাতঙ্কের টিকা দিতে এসেছেন।
জলাতঙ্কের টিকা নিতে রোববার হাসপাতালে এসেছিলেন অনন্ত বাদালশো গ্রামের গোপাল পোদ্দার। তাঁর ভাষ্য, গত শনিবার বিড়ালকে আদর করতে যান। এ সময় বিড়ালটি নখ দিয়ে তাঁকে আঁচড় দিয়েছে। বিড়ালের টিকা দেওয়া ছিল না বলে তিনি টিকা নিতে এসেছেন।
ইপিআই প্রকল্পের টেকনিশিয়ান রইচ উদ্দিনের চোখে বিড়াল-কুকুরের আক্রমণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী আসার সংখ্যা অস্বাভাবিক। দিনে তারা শতাধিক রোগীকে জলাতঙ্কের টিকা দিচ্ছেন। এজন্য ২০ ভাউয়েল টিকার চাহিদা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে তিন দিনের টিকা মজুত আছে।
ইপিআই প্রকল্পের আওতায় গত সেপ্টেম্বর মাসে ১ হাজার ৩৫০টি জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি টিকা দিতে হয়েছে কুকুরের কামড়ের ঘটনায়। দুটি বানরের ও একটি ঘটনা ইঁদুরের আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত। বাকি সব টিকা দিতে হয়েছে বিড়ালের কামড়-আঁচড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত অক্টোবর মাসে এখানে জলাতঙ্কের টিকা নিয়েছেন ৯৩৯ জন। তাদের মধ্যে ১৭ জন কুকুরের হামলার শিকার। বিড়ালের আক্রমণে টিকা নিয়েছেন বাকি ৯২২ জনই।
ইপিআই টেকনিশিয়ান রইচ উদ্দিনের দেওয়া তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর মাসের আগে তাদের মাসে ৪-৫ ভায়াল জলাতঙ্কের টিকার প্রয়োজন হতো। প্রতি ভায়ালে ৫ জনের টিকা দেওয়া যায়। সেই হিসাবে মাসে তারা গড়ে ২০-২৫ জনকে জলাতঙ্কের টিকা দিতেন। কিন্তু সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে টিকার চাহিদা বেড়ে ১৫-২০ ভায়ালে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন বলেন, জলাতঙ্কের টিকা নিতে মানুষের ভিড় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দিনে প্রায় শতাধিক মানুষ আসছেন। এর মধ্যে বিড়ালের আক্রমণের
সংখ্যাই বেশি। সরকারি বরাদ্দের বাইরে গিয়ে জলাতঙ্কের টিকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রাসেল আহমেদ বলেন, অধিকাংশ বাড়িতে এখন বিড়াল পোষার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু যারা পুষছেন, তাদের বেশির ভাগই সচেতন নন। কুকুর-বিড়ালের মাধ্যমে আক্রান্ত হলে জলাতঙ্ক হয়। এমন প্রাণী লালনপালন করতে হলে টিকার আওতায় আনতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ পালনকারী প্রাণীদের জলাতঙ্কের টিকা দেন না। এ কারণের
আঁচড় বা কামড় দিলেই তারা জলাতঙ্কের
টিকার জন্য হাসপাতালে ছুটছেন। প্রাণীদের যদি টিকা দেওয়া থাকত, তাহলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি থাকত না।
- বিষয় :
- বিড়াল