গাইবান্ধায় প্রিপেইড মিটার নিয়ে ধূম্রজাল
থমকে আছে ২১ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপন
মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘১৫০০ টাকা রিচার্জ করলাম, মিটারে ঢুকল ৬৭৫ টাকা! বাকিটা ধারের টাকা, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া আর ভ্যাট হিসেবে কেটে নেওয়া হয়েছে। আগে তো এত টাকা কাটত না।’ ক্ষোভ আর আক্ষেপ মিশিয়ে কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান।
শুধু টাকা কাটাই নয়, রিচার্জের পর আসা ২২০ সংখ্যার দীর্ঘ টোকেন নম্বর মিটারে তুলতে না পেরে রাতভর বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে থাকতে হয়েছে এই সাধারণ গ্রাহককে। পরে বিদ্যুৎ অফিসের লোক ডেকে সংযোগ সচল করতে হয়। মোস্তাফিজুর রহমানের মতো গাইবান্ধার হাজারও সাধারণ ও নিম্ন আয়ের বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে প্রিপেইড মিটার এখন এক আতঙ্কের নাম।
উন্নত সেবা ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধের কথা বলে প্রিপেইড মিটার চালু করা হলেও গাইবান্ধায় নর্দার্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নেসকোর গ্রাহক ভোগান্তি এখন চরম আকার ধারণ করেছে। মিটারের জটিল কারিগরি প্রক্রিয়া, মাত্রাতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়া এবং জবাবদিহির অভাবে ক্ষোভে ফুসছেন গ্রাহকরা। আস্থার সংকট এতটাই ঘনীভূত হয়েছে যে, ৪৯ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ২১ হাজারই নিজ বাড়িতে এই মিটার বসাতে সরাসরি বাধা দিচ্ছেন। ফলে এই অঞ্চলে সরকারের স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপন প্রকল্প এক প্রকার থমকে গেছে।
ভোগান্তির মাত্রা বুঝতে সরেজমিন দেখা যায়, জটিল এই ব্যবস্থার দরুন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষরা। ধানঘরা গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান জানান, গভীর রাতে হঠাৎ ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে যায়। তখন বিকাশ বা অনলাইনে টাকা না থাকলে ভোগান্তির সীমা থাকে না।
শহরের ব্রিজ রোডের হোটেল ব্যবসায়ী ছদরুল মিয়ার মতে, এক মিটারে একাধিক ভাড়াটিয়া থাকায় কার কত বিদ্যুৎ খরচ হলো তা বোঝার উপায় থাকে না, যা নিয়ে প্রায়ই বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে। এমনকি সাধারণ মানুষ রিচার্জের পর অহেতুক টাকা কেটে নেওয়ারও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করছেন। ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজনীন আক্তার বলেন, এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে শুরুতেই ২০০ থেকে ৩০০ টাকা গায়েব হয়ে যায়। আর বকেয়া থাকলে রিচার্জ করার পর প্রায় তিনগুণ টাকা কাটা হয়।
একই এলাকায় দুই ধরনের নিয়ম চালু থাকায় অসন্তোষ আরও বাড়ে। সদর উপজেলার সেলুন ব্যবসায়ী সাঈদ মিয়া জানান, তাঁর দোকানের মিটারে টাকা সরাসরি প্রবেশ করলেও বাড়ির মিটারে ২০০ সংখ্যার ওপর দীর্ঘ টোকেন এসএমএস তুলে লাইন চালু করতে হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। অথচ নতুন ব্রিজ এলাকার চা দোকানি সাজু মিয়া জানান ভিন্ন কথা। তাঁর প্রিপেইড মিটারে সরাসরি টাকা ঢোকে এবং বিলের ক্ষেত্রে কোনো ঝামেলা নেই। বেশির ভাগ সাধারণ গ্রাহকই এই দুই ব্যবস্থার ফারাক বুঝতে পারছেন না, যার মূল কারণ নেসকোর মাঠপর্যায়ের পর্যাপ্ত প্রচার ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনার অভাব।
প্রিপেইড মিটারের এই ‘পকেট কাটা’ ও ভোগান্তির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে রাজপথে নেমেছেন গাইবান্ধার নাগরিক সমাজ ও বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। গত ১৯ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধা ডিজিটাল প্রিপেইড মিটার প্রতিরোধ কমিটি ও বিদ্যুৎ গ্রাহক অধিকার রক্ষা জাতীয় কমিটি শহরের ডিবি রোডে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসা স্পষ্ট জানান, যে কোনো প্রযুক্তি জনবান্ধব না হলে তার সুফল পাওয়া যায় না। গ্রাহক কী খাতে টাকা দিচ্ছেন, তা এটিএম কার্ডের মতো পরিষ্কারভাবে জানার অধিকার তাদের রয়েছে। একই দাবিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ অফিস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করে সেচ পাম্প মালিক সমিতিও। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আনাউর রহমান অনু জানিয়ে দিয়েছেন, অস্পষ্ট ও শোষণমূলক প্রিপেইড ব্যবস্থা বাতিল করে আগের ডিজিটাল মিটার বহাল করতে হবে।
গ্রাহকদের এই ক্ষোভ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা বিদ্যুৎ অফিসের (নেসকো) নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, আগের পোস্টপেইড মিটারে ভূতুড়ে বিলের ভয় থাকলেও প্রিপেইডে সেটি নেই।
তিনি জানান, প্রতি মাসের প্রথম রিচার্জে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মিটার ভাড়া বাবদ ১৪৯ টাকা কাটা হয়, আর বাকি টাকা কাটানো হয় বকেয়া সমন্বয়ের কারণে। কোনো মাসে রিচার্জ না করলে পরবর্তী মাসে ২-৩ মাসের টাকা এক সঙ্গে কেটে নেওয়া হয় বলেই গ্রাহকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। টোকেনের দীর্ঘ সংখ্যার বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পর সিস্টেমে সমন্বয়ের জন্য গ্রাহকদের জীবনে একবারই এই ২২০ ডিজিট টিপতে হয়েছে, যা অনলাইন হলে আর থাকবে না। বর্তমানে ৯০ শতাংশ গ্রাহক অনলাইনে চলে এসেছেন এবং শিগগিরই শতভাগ অনলাইন হলে এই ভোগান্তি দূর হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
- বিষয় :
- মিটার চুরি