বাস-ট্রাক সংঘর্ষ
রাজশাহী যাওয়ার পথে বাবা-মেয়ের মৃত্যু, গুরুতর আহত মা-ছেলে হাসপাতালে
শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রুবিনা বেগম
পটুয়াখালী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:১৪ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:১৭
নাটোরে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ব্যাংক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম ও তার কন্যা তাসফিয়া (৮) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তার স্ত্রী ও ছোট ছেলে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিবারটি পূজার ছুটিতে মাগুরা থেকে রাজশাহী বেড়াতে যাচ্ছিল। মঙ্গলবার নাটোর মহাসড়কে বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত শহিদুল ইসলামের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মির্জাগঞ্জ গ্রামে। তিনি মাগুরা জেলায় ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ দুর্ঘটনায় তার সঙ্গে মারা গেছে তার ছোট মেয়ে।
দুর্ঘটনায় শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুবিনা বেগম ও ছোট ছেলে লাবিব (১১) গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রুবিনা বেগম পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী পূবালী ব্যাংক শাখায় কর্মরত আছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, পূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে রাজশাহী ভায়রার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন শহিদুল ইসলাম। এর আগে গতকাল সোমবার বিকেল ৪টার দিকে রুবিনা বেগম তার দুই সন্তানকে নিয়ে মির্জাগঞ্জ থেকে স্বামী শহিদুল ইসলামের কর্মস্থল মাগুরায় যান। সেখান থেকে আজ সকালে সপরিবার বাসে উঠে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হন তারা। পথিমধ্যে নাটোরে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ট্রাকের সঙ্গে তাদের বহনকারী বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই শহিদুল ইসলাম ও তার মেয়ে মারা যান।
মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে রামেক হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, দুই সারি শয্যার মাঝখানে আহত অবস্থায় একটি স্ট্রেচারে আছে লাবিব। হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রায় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তখনো শয্যা পায়নি সে। কিছুক্ষণ পর লাবিব ও তার মাকে সিটি স্ক্যান করাতে বহির্বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে আরও ৩০ থেকে ৪০ মিনিট কাটে। পরে তাদের আবার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়। দুপুর ২টা পর্যন্তও তাদের শয্যার ব্যবস্থা হয়নি।
লাবিবের খালু শহিদুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘দুর্গাপূজার ছুটিতে ওরা সপরিবারে আমাদের বাড়িতে আসছিল। লাবিব-তাসফিয়া আর আমার দুই সন্তান খুব আনন্দিত ছিল। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ওরা কোথায় আছে জানতে শহিদুলকে ফোন করি। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। ফজরের নামাজ শেষে আবার ফোন করলে এক পুলিশ সদস্য দুর্ঘটনার খবর জানান। এরপরই আমরা নাটোরের উদ্দেশে রওনা হই।’
তিনি বলেন, ‘সেখানে গিয়ে দেখি, শহিদুল ও তাসফিয়া আর নেই। লাবিব ও রুবিনার অবস্থাও গুরুতর ছিল। তারা কথা বলতে পারছিল না, হুঁশও ছিল না। দ্রুত তাদের রামেক হাসপাতালে নিয়ে আসি। কিন্তু এখানে আসার পর দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো শয্যা পাইনি। পরে সিটি স্ক্যানের জন্য নেওয়া হয়। স্ক্যানের পর শয্যা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’
কথা বলতে বলতে বিমর্ষ হয়ে পড়েন শহিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ওদের বাবা-মা দুজনই চাকরি করতেন। তাই লাবিব-তাসফিয়ার খুব একটা বেড়াতে যাওয়া হতো না। এবারের ছুটিটা নিয়ে ওরা অনেক আনন্দিত ছিল। কিন্তু সেই আনন্দ আর রইল না। ওদের বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্নটাই শেষ হয়ে গেল।’
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নিহত শহিদুল ইসলামের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, পূজার ছুটিতে সবাই মিলে রাজশাহীতে আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ করতে যাচ্ছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল। আমার ভাই শহিদুল ইসলাম ও ভাতিজি তাসফিয়া ঘটনাস্থলেই মারা গেছে। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ও নিষ্পাপ সন্তানটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।
মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এতে ১৪ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৪ জন রামেক হাসপাতালে ভর্তি। নাটোর জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার দুর্ঘটনার খবর নিশ্চিত করেছেন।
বনপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক শামীম হোসেন বলেন, বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাই নবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের বাসের সঙ্গে বিপরীতমুখী বালুবোঝাই একটি ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এ সময় ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়।
তিনি জানান, আহতদের উদ্ধার করে বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। সড়কে এখন যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন- জাজিরা উপজেলার আরোব আলী ফকিরের ছেলে সামাদ ফকির (৭০), কাজিরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবি সাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার শালাল মোল্লা (৪৫), কাজির হাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), রাজাশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে ও বাসটির চালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামে বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০) এবং ফরিদপুরের বাকুন্দা এলাকার অমুল্য চন্দ্রের ছেলে হিমেস (২৮)।
- বিষয় :
- সড়ক দুর্ঘটনা
- নিহত