মেয়ে বেঁচে আছেন, নাকি পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ কিছু—প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পরিবার
সুইটি আক্তারের বাবা-মা
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৩০ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:০৫
‘আমার সুইটিরে আইনা দাও তোমরা। বাইচ্চা থাক বা মইরা যাক, আমার মেয়েরে আমার কাছে আন।’ সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এভাবেই মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জহুরা বেগম। ছড়িয়ে পড়া ছবির এক নারী তাঁর মেয়ে সুইটি আক্তার (২৫) বলে পরিবারের সন্দেহ। তবে সরকারি কোনো সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার।
তিন বছর আগে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুইটি। গত ১৩ অক্টোবর পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় তাঁর। তখন মাকে জানিয়েছিলেন, দুই মাস পর দেশে ফিরবেন। কিন্তু এরই মধ্যে সৌদিতে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়ায় মেয়ের পরিণতি নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে মা-বাবার।
সুইটি মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামের ফজল মিয়ার মেয়ে। মঙ্গলবার তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মেয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা। আর নির্বাক বাবা তাকিয়ে আছেন মেয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায়। সুইটি বেঁচে আছেন, নাকি তাঁর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ কিছু—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তাঁরা।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় কখন এক সপ্তাহ, কখন এক মাস পর কথা বলত। এভাবে এক বছর চলার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ এক বছর পর সুইটি আবার ফোনে যোগাযোগ করে। তখনো জেলে থাকার কথা বলেছিল। এভাবে প্রায় চার মাস চলে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। সর্বশেষ মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সঙ্গে কথা হয়। তবে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানায়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় সুইটির প্রথম বিয়ে হয় উপজেলার তরফপুর গ্রামে। এক বছরের মাথায় সেই সংসার ভেঙে যায়। এর এক বছর পর হিলড়া গ্রামে দ্বিতীয় বিয়ে হয় তাঁর। ধারদেনা করে দ্বিতীয় স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিল পরিবার। তবে দেশটিতে যাওয়ার ছয় মাস পর থেকে সুইটির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তিনি। পরে তাঁদেরও বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
২০২৩ সালে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান সুইটি। স্বজনদের দাবি, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। এ জন্য নতু মিয়া নামে এক দালালকে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়। সৌদি আরবের মক্কায় আল মাজাল আল আরবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর সুইটি গ্রেপ্তার হন। তবে পরিবার এ খবর জানতে পারে প্রায় এক বছর পর। স্বজনদের ভাষ্য, ফোনে সুইটি নিজেই আটকের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের বলেছিলেন, মারামারির মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে প্রবাসে থাকা তাঁর এক বান্ধবী পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সুইটি।
সুইটির মা জহুরা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে মক্কায় বয়স্ক মানুষের সেবা করত। সে ঝগড়া করে না। অন্য মেয়েরা ঝগড়া করছে, তখন সুইটিরেও ধইরা নিছে।’ মেয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য না পাওয়ায় তাঁর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, ‘আমি ভ্যান চালিয়ে কষ্ট কইরা কামাই করি। সুখের আশায় ধারদেনা কইরা মেয়েকে বিদেশে পাঠাইছি। ছয় মাস ভালোই কাজকাম করল। তারপর থ্যাইকা আর খবর পাই না। অন্য সাইটে ঝগড়া হইছে, আর পুলিশ আমার মেয়েরে ধইরা নিছে।’
প্রতিবেশী বিদ্যুৎ সাহা বলেন, সুইটির কী অপরাধ, তা তাঁরা জানেন না। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, সুইটি জীবিত থাকলে তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। আর তাঁর মৃত্যুর খবর সত্য হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ বিষয়ে তাঁদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়ায় পুলিশ সুইটির বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছেন তাঁরা। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।