বুলেট বৈরাগী হত্যা
পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট, চাকরি ও সহায়তা পাননি স্ত্রী
বুলেট বৈরাগী
কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৩৫
কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মঙ্গলবার আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এদিকে স্বামীকে হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া বুলেট বৈরাগীর স্ত্রী উর্মি হীরা জানিয়েছেন, সরকারি সহায়তা ও চাকরির আশ্বাস পেলেও এখনো কিছুই পাননি তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান সাংবাদিকদের চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বুলেট বৈরাগী (৩৫) কুমিল্লার বিবির বাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বিসিএস নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ছিলেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম সুশীল বৈরাগী। চাকরির সুবাদে তিনি পরিবার নিয়ে কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জের পানপট্টি এলাকায় বসবাস করতেন। তার স্ত্রী, এক শিশুসন্তান ও মা-বাবা রয়েছেন।
চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন- কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার নাওতলা গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে মো. সোহাগ (৩৪), আদর্শ সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকার মৃত হারুন মিয়ার ছেলে ইসমাইল হোসেন জনি (২৮), একই উপজেলার আমড়াতলী গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে এমরান হোসেন ওরফে হৃদয় (৩৪), আড়াইওরা গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে রাহাত হোসেন জুয়েল (২৭) এবং ধর্মপুর এলাকার মৃত সজল মিয়ার ছেলে মো. সুজন (৩২)। তারা বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
পুলিশের ভাষ্য, আসামি জনি, জুয়েল ও সুজনের স্থায়ী ঠিকানা তদন্তে শনাক্ত করা যায়নি। এ কারণে চার্জশিটে তাদের ‘ভাসমান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘এখন কীভাবে সংসার চলবে, জানি না’
মঙ্গলবার রাতে বুলেট বৈরাগীর স্ত্রী উর্মি হীরা বলেন, ‘বুলেটের উপার্জনে আমাদের পরিবারের ভরণপোষণ চলত। ছেলেকে হারিয়ে তার বাবা-মা এখন দিশাহারা। এখন কীভাবে সংসার চলবে, জানি না।’
উর্মি হীরা আরও বলেন, কুমিল্লা নগরে তাদের বাসাটি এখনো রয়েছে। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে গিয়ে কষ্ট হচ্ছে। চাকরির আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কাস্টমস বিভাগ থেকেও তারা প্রাপ্য সরকারি অর্থ পাননি। তিনি সরকারের কাছে চাকরির ব্যবস্থা ও স্বামীর হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানান।
যেভাবে হত্যা করা হয় বুলেটকে
বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রামের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে গত ২৪ এপ্রিল রাতে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন। ওই দিন গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ঝাগুরজুলি এলাকায় বাস থেকে নামার পর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি।
পরদিন ২৫ এপ্রিল সকালে কুমিল্লার ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানা-পুলিশ সদর দক্ষিণ উপজেলার মহাসড়কের বাতাবাড়িয়া এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের কাছে পড়ে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পরিবারের সদস্যরা হাইওয়ে থানায় গিয়ে মরদেহটি বুলেট বৈরাগীর বলে শনাক্ত করেন।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীরা বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে থাকা টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় তার মা লিলিমা বৈরাগী বাদী হয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। পরে র্যাব তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আলম শাহ বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচ আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তার ভাষ্য, টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রীবেশে ছিনতাইকারীরা বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় তাকে অটোরিকশা থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মাথায় আঘাত পেয়ে তার মৃত্যু হয়।
মামলার বাদী ও বুলেট বৈরাগীর মা লিলিমা বৈরাগী বলেন, ডিবি পুলিশ তাকে চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানকে তো আর ফিরে পাব না। বুলেটের শিশুটিও কম বয়সে বাবাকে হারিয়েছে, বউটিও বিধবা হলো। যারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তি দেখতে চাই।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ডিবি পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। আদালত চার্জশিট গ্রহণ করে বিচারের জন্য মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠিয়েছেন।