ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

নাটোরে ছাত্রদল নেতা হত্যা

রাজনৈতিক বিরোধের বাইরেও কারণ খুঁজছে পুলিশ

রাজনৈতিক বিরোধের বাইরেও কারণ খুঁজছে পুলিশ
×
×

শাকিল ইসলাম

নাটোর সংবাদদাতা

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম খুনের নেপথ্যে রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে অন্য কারণ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। স্বজনদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড। এতে জড়িত থাকতে পারেন নাটোর-৪ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আব্দুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুও। তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

শাকিলকে (২৩) গত ১৪ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে বিলচলন শামসুজ্জোহা কলেজের কাছে একটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়। গত সোমবার রাতে হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। শাকিল গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় খোয়ারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আপাতত এই হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ জন্য রাজনীতির বাইরে আরও কয়েকটি কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক কিছু ক্লু পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে দুজন ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন শাকিলকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে আসেন। শাকিলও মোটরসাইকেলে ছিলেন। তবে কৌশলে তাঁকে মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে কোনো সিসি ক্যামেরা ছিল না। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পরিকল্পিতভাবেই স্থানটি বেছে নিয়েছিল দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, মূল পরিকল্পনাকারীরা নেপথ্যে থেকে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত শাকিলের দায়ের করা কোনো জিডি খুঁজে পায়নি পুলিশ। শপিংমলে লুটপাটে অংশগ্রহণকারীদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে। এতে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। 

এদিকে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের মধ্যে একজনের বাড়ি ছিল এমপির এলাকায়।

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন নেতা বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, এমপির এলাকার যে তরুণ ওই মোটরসাইকেলে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে মিন্টুর ঘনিষ্ঠতা আছে। ওই তরুণ মূলত শাকিলকে শনাক্ত করেন। তাঁকে প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। পরে একটি ফাঁকা গুলি করে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

শাকিলের সঙ্গে মিন্টুর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তবে গত ছয় মাসে তাদের সম্পর্কে পরিবর্তন আসে। শাকিল সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের সঙ্গে চলাফেরা শুরু করেন। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা মনে করেন, এই সম্পর্কের পরিবর্তনও হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, ঘটনার দিন হামলাকারীদের মধ্যে ধারাবারিষা ইউনিয়নের নয়াবাজার এলাকার একজনকে দেখেছেন বলে এক প্রত্যক্ষদর্শী তাঁকে জানিয়েছিলেন। তবে ওই ব্যক্তি কে, তা প্রত্যক্ষদর্শী নিশ্চিত করতে পারেননি। এ কারণে মিন্টুকে ঘিরে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এটি প্রত্যক্ষদর্শীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর ধারণা, হত্যাকাণ্ডে মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নয়।

স্বজনদের সন্দেহের তীর
শাকিলের বাবা ও মামলার বাদী রবিউল করিম এবং তাঁর চাচা সুমন আলীর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইনের সঙ্গে শাকিলের বিরোধ ছিল। রাসেল দুই মাস আগেও তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন। তাদের সন্দেহ, রাসেলের হুকুমে শাকিলকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

রাসেল হোসাইন গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের কচুগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় ব্যবসা করছেন। গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় বাজারে তাঁর একটি শপিংমল রয়েছে।

শাকিলকে হুমকি দেওয়া এবং তাঁকে হত্যার হুকুমদাতা হিসেবে স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে গতকাল বুধবার জানতে চাইলে রাসেল সমকালকে বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে আছেন। স্থানীয় মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে শপিংমলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরু থেকেই একটি পক্ষ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করার চেষ্টা করছে। 

শাকিলের জানাজার পর তাঁর শপিংমলে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাকে ওই পক্ষের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন রাসেল। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় শপিংমল থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মালপত্র লুট হয়েছে। তিনি হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

হামলার প্রতিবাদ করেও মারধরের শিকার
গত ১৪ অক্টোবর শাকিলকে কুপিয়ে জখম করার পর স্থানীয় নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। বিএনপির কর্মী শাহ আলমও ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিয়ে হামলাকারীদের বিচারের দাবি করেন। পরে নয়াবাজার এলাকায় তাঁর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

শাহ আলমের দাবি, শাকিলের ওপর হামলার প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, মিন্টু এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছিলেন। এর জেরেই তাঁর ওপর এ হামলা চালানো হয়। এ হামলার সঙ্গে শাকিল হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শাকিলের চাচা ও যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ বলেন, শাকিল আহত হওয়ার পর মিন্টু তাঁর খোঁজ নেননি; বরং হামলার প্রতিবাদকারীর কেউ কেউ হুমকি ও মারধরের শিকার হয়েছেন। এসব কারণে মিন্টুকে ঘিরে তাদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাণনাশের আশঙ্কায় ফেসবুকে যা লিখেছিলেন শাকিল
শাকিল বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন ২০১৫ সালে। ২০২০ সালে পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব নির্বাচিত হন বলে জানান রাজনৈতিক সহকর্মী উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রানা। 

বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, গত মার্চ-এপ্রিলে এমপি আব্দুল আজিজের এক ছেলের সঙ্গে মাদকের একটি চালান নিয়ে শাকিলের বিরোধ দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০ এপ্রিল শাকিল তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে। যারা আমাকে মারতে পারবে, তাদেরকে নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডাইরি (ডায়েরি) করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে ওই ডাইরি অনুযায়ী মামলা করে দিবেন। আর আমাকে হামলা করার পরে যদি আমি বেঁচে যাই, তাহলে তো ভাই বুঝতেই পারতিছেন, কী হবে এই শহরে, আমি কামলা দিয়ে কাজ করাই না, সাবধান ভাই।’

শাকিল হত্যায় ছেলের জড়িত থাকা এবং মাদক ব্যবসায় তাঁর ছেলেদের জড়িয়ে পড়াসহ অন্য সব অভিযোগের বিষয়ে এমপি আব্দুল আজিজ গণমাধ্যমকে বলেছেন, দলের ভেতরে ও বাইরের একটি চক্র তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘শাকিল ২৪ ঘণ্টা আমার সঙ্গেই থাকত। তার পরিবার আমাদের ঘনিষ্ঠ। হামলার পর তার চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করেছি। অনেকবার কথা হয়েছে। কারা হামলা করেছে, সেটা সে বলতে পারেনি। এখন মৃত্যুর পর ছেলেকে জড়িয়ে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে।’ 

জিডির বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য
শাকিল গত ২০ এপ্রিল নিজের নিরাপত্তা চেয়ে গুরুদাসপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন বলে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তবে পুলিশ বলেছে, এ ধরনের কোনো জিডির তথ্য তারা পায়নি।

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম বলেন, শাকিলের বাবা রবিউল করিম গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আট-দশজনকে আসামি করে মামলা করেন। এরপর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত শুরু করে। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর গতিবিধি ও কর্মকাণ্ডও খতিয়ে দেখা হয়। পরে সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

পুলিশের আবেদনের পর আদালত মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে চাননি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তিনি বলেছেন, নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। 

জানাজায় এমপিকে ভুয়া ভুয়া স্লোগান
শাকিলের মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শাকিল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত সোমবার রাতে মারা যান। পরদিন মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুরের বিলচলন সামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে শাকিলের জানাজা হয়। সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ এতে অংশ নিয়ে শাকিলের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লি অনেকে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন। জানাজা শেষ করে তিনি ফিরে যান।

জানাজায় জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুসহ জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা অংশ নেন। 

এদিকে শাকিলের জানাজা শেষে চাঁচকৈড় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাসেলের ‘রাস’ শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
 
এমপিপুত্র মিন্টুকে যুবদল থেকে বহিষ্কার, ওসি প্রত্যাহার
শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া নুরুজ্জামান মিন্টুকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তাঁকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। গত মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। 

একই ঘটনায় গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নানকে প্রত্যাহার করে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ
শাকিল হত্যার প্রতিবাদ ও আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবিতে নাটোরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ছাত্রদল। গতকাল বিকেলে নাটোর আলাইপুর জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল বের করে নাটোর জেলা ছাত্রদল। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহরের কানাইখালী প্রেস ক্লাব চত্বরে এসে সমাবেশ করে।

সমাবেশে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি কামরুল ইসলাম বলেন, শাকিল নিবেদিত নেতা ছিলেন। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত এর ব্যবস্থা না করলে ছাত্রদল রাজপথে নেমে নানা কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

আরও পড়ুন

×