ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

পে ফিক্সেশন জমা বাবদ টাকা আদায়, পিকনিকে যেতে চাপ

পে ফিক্সেশন জমা বাবদ টাকা আদায়, পিকনিকে যেতে চাপ
×
×

বরিশাল ব্যুরো

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলের পে ফিক্সেশন (বেতন নির্ধারণী) কাজটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অনলাইনে নিজেই সম্পন্ন করবেন– প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকেই এমন নির্দেশনাই ছিল। কিন্তু ভিন্ন ঘটনা ঘটেছে বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়। পে ফিক্সেশন জমা দেওয়া বাবদ প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি হিজলাতে শিক্ষকদের জনপ্রতি আড়াই হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে কুয়াকাটায় পিকনিকে যেতে শিক্ষা অফিস থেকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহায়তায় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতারা পে ফিক্সেশনের টাকা তুলছেন। ওই নেতারা স্থানীয়ভাবে বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত। এ নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও হয়রানির ভয়ে সাধারণ শিক্ষকরা প্রতিবাদ করতে পারছেন না।
জানা গেছে, দুই উপজেলার শিক্ষা অফিসে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত হয়– প্রত্যেক শিক্ষক নিজেই অনলাইনে পে ফিক্সেশন আবেদন করবেন এবং এর প্রিন্ট কপি সশরীরে উপস্থিত হয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দেবেন। ২০ অক্টোবরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে শারদীয় দুর্গোৎসবের ছুটির জন্য সময় বৃদ্ধি করে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত করা হয়। হিজলায় ৮৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষক এবং মেহেন্দীগঞ্জে ২০৮টি বিদ্যালয়ে ১২০০ শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানিয়েছেন, হিজলায় উপজেলা শিক্ষা অফিসে প্রিন্ট কপি জমা দিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষকরা। সমিতির নেতাদের প্রতিনিধি শিক্ষকরা সেখানে উপস্থিত থাকেন। নিয়মানুযায়ী অফিস সহকারীরা কপি গ্রহণ করবেন। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা অফিসে গেলে অফিস সহকারীরা ৩০০ টাকাসহ আবেদনের কপি নেতাদের প্রতিনিধিদের কাছে দিতে নির্দেশ দেন। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির হিজলা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাভেদ হোসেন ও সহকারী শিক্ষক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. রূহুল আমিনসহ আরও কয়েকজন ‘চাঁদা’ তোলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

দক্ষিণ সৈয়দখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি পে ফিক্সেশন আবেদনের প্রিন্ট কমিটি উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দিতে যান। তখন উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষকের কাছে আবেদন ও ৩০০ টাকা দিতে বলা হয়। ওই শিক্ষকরা উপজেলা শিক্ষক সমিতির বিভিন্ন পদে নেতৃত্ব দেন। তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাদের সঙ্গে তাঁর তর্কবিতর্ক হয়।
সাইফুলের ভাষ্যমতে, মনোবল শক্ত থাকা গুটিকয়েক শিক্ষক প্রতিবাদ করলেও বেশির ভাগ শিক্ষক ঝামেলা এড়াতে ৩০০ টাকা করে দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্ত গত ১৫ অক্টোবর শিক্ষা অফিসে অনুষ্ঠিত সভাতে বলা হয়েছিল, পে ফিক্সেশন আবেদনে টাকা লাগবে না।

অভিযোগের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে সহকারী শিক্ষক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. রূহুল আমিন বলেন, ‘কিছু শিক্ষক আগের মতো প্রভাব খাটতে না পেরে এসব মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় না।’
উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাভেদ হোসেনের ভাষ্য, উপজেলা শিক্ষা অফিসে জনবল সংকট রয়েছে। তাই কয়েকজন শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা অফিসে উপস্থিত থেকে পে ফিক্সেশন কাজে সহায়তা করেন। এ জন্য চা খেতে কিছু টাকা নেওয়া হয় বলে তিনি শুনেছেন।
এদিকে হিজলা উপজেলার একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, শিক্ষা অফিস থেকে আড়াই হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় যেতে শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বেশিরভাগ শিক্ষক

অস্বীকার করলে সেটা লিখিতভাবে 
জানাতে নির্দেশ দেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তপা বিশ্বাস। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
অভিযোগের বিষয়ে তপা বিশ্বাস সমকালকে বলেন, ‘প্রথমে ক্লাস্টার ভিত্তিক পিকনিকের সিদ্ধান্ত হলেও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে বার্ষিক পরীক্ষার পর পুরো উপজেলার শিক্ষকদের নিয়ে পিকনিকের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিভিন্ন কারণে অনেকে যেতে পারবেন না। তাই প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের জন্য তাদের লিখিত জানাতে বলা হয়।’
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রোমাঞ্চ আহমেদ পে ফিক্সেশন বাবদ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেছেন, ‘কেউ টাকা নিলে তাকে যেন হাতেনাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়।’ শিক্ষকদের  পিকনিক বিষয়ে তিনি বলেন, বার্ষিক পরীক্ষার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
এ বিষয়ে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সরকারি পোমা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পে ফিক্সেশন নির্ধারণে সময় কম, তাই  সবাই মিলে কাজটা করেছি। হয়তো যাতায়াতের খরচ হিসেবে কিছু নেওয়া হতে পারে। কিন্তু প্রতি পে ফিক্সেশন বাবদ ৩০০ টাকা করে দেওয়ার নিয়ম কোথাও নেই। শিক্ষক সমিতি এর সঙ্গে জড়িত নয়।’
এ ব্যাপারে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, তিনি নোটিশ দিয়ে যার যার ফিক্সেশন করে নিতে বলেছেন। এখন কেউ যদি নিজের কাজ অন্যকে দিয়ে করায় তাহলে আমাদের কি করার আছে।

আরও পড়ুন

×