নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নামছেন চাঁদপুরের ৫০ হাজার জেলে
খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি নগদ অর্থ চান জেলেরা
চাঁদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:৩৬
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে নামছেন ৫০ হাজারের বেশি জেলে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। শুক্রবার থেকে নতুন করে ইলিশ আহরণের প্রস্তুতি নিয়েছেন জেলেরা। তাদের আশা, এবার নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়বে, ঘুচবে আর্থিক সংকট।
গত ৮ অক্টোবর থেকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটার এলাকাসহ দেশের ছয়টি অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। এ সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয়সহ ইলিশ আহরণ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় গত কয়েক দিন ধরেই পদ্মা-মেঘনার তীরে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন জেলেরা। কেউ নৌকা মেরামত করেছেন, কেউ ছেঁড়া জাল ঠিক করেছেন, আবার কেউ প্রস্তুত করেছেন নতুন জাল। দীর্ঘ বিরতির পর নদীতে নামার অপেক্ষায় তাদের চোখেমুখে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে অনেক জেলেকে। কয়েকজন জেলে জানান, সরকারি সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। সংসারের খরচ মেটাতে অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, কেউ আবার দাদনদারের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন। একটি নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম মেরামত বা প্রস্তুত করতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ না পেলে লোকসানে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জনপ্রতি ২৫ কেজি চাল দেওয়া হলেও তা দিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। তাদের দাবি, খাদ্যসহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি চালের সঙ্গে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও নগদ অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
অভিযান নিয়েও কয়েকজন জেলে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু জেলে রাতে অর্থের বিনিময়ে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ পেয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নৌপুলিশের কর্মকর্তারা।
চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজমগীর হোসাইন বলেন, যারা মাছ শিকারে ব্যর্থ হয়ে বারবার নদীতে নামার চেষ্টা করেন এবং নিয়ম মানেন না, তারাই মূলত অপপ্রচার ও গুজব ছড়াচ্ছেন। নৌপুলিশের দাবি, এবারের অভিযান সফল হয়েছে।
চাঁদপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামও অভিযান সফল হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, বিশাল নদী অঞ্চলে অভিযান পরিচালনায় যানবাহন ও জনবলের সংকট রয়েছে। তা সত্ত্বেও জেলা টাস্কফোর্স, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে কঠোর অভিযান চালিয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ দিনের অভিযানে পাঁচ শতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও মাছ ধরার নৌকা জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকও একাধিক দিন অংশ নেন।
জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু নির্দিষ্ট সময়ের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। সারা বছর অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ এবং জাটকা নিধন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রকৃত জেলেদের সহায়তা বাড়ানো, নগদ অর্থ প্রদান এবং আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ ধরার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।