ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব উদযাপন

মোমের আলোয় আলোকিত গারো পাহাড়, প্রার্থনায় হাজারো পুণ্যার্থী

মোমের আলোয় আলোকিত গারো পাহাড়, প্রার্থনায় হাজারো পুণ্যার্থী
×
×

জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে আলোর মিছিলে অংশ নেন হাজারো পুণ্যার্থী। ছবি: মিজানুর রহমান/সমকাল

মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:৪৫ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:৪৮

হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি। কণ্ঠে প্রার্থনা সংগীত। সামনে-পেছনে হাজারো খ্রিষ্টভক্ত। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলে শোভাযাত্রা। মোমবাতির কোমল আলোয় ঝলমল করে গারো পাহাড়ের পাদদেশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বারোমারী সাধু লিওর খ্রিষ্টধর্মপল্লিতে দেখা যায় এমন দৃশ্য।

মা মারিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে আসা পুণ্যার্থীরা অংশ নেন এই শোভাযাত্রায়। 

‘মানবতার জননী: ফাতেমা রানী মা মারিয়া’ মূল সুরকে সামনে রেখে গত বৃহস্পতিবার শুরু হয় ক্যাথলিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ২৯তম বার্ষিক ফাতেমা রানী তীর্থোৎসব। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজন শেষ হয়েছে গতকাল শুক্রবার সকালে মহাখ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে।

এখানে ফাতেমা রানী বলতে খ্রিষ্টানদের কাছে শ্রদ্ধেয় মা মারিয়া বা ভার্জিন মেরিকে বোঝানো হয়েছে। তিনি যিশুখ্রিষ্টের মা।

পর্তুগালের ফাতেমা নগরে ১৯১৭ সালে তিন রাখাল শিশুর কাছে মা মারিয়ার আবির্ভাবের কথা ক্যাথলিক ঐতিহ্যে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। সেই ফাতেমা নগরের নাম থেকেই বাংলাদেশের এই তীর্থোৎসবের নামকরণ।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মোমবাতি হাতে আলোর শোভাযাত্রা। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় ৫০ হাজার পুণ্যার্থী এতে অংশ নেন। দুই কিলোমিটারের বেশি আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ হেঁটে হেঁটে পাড়ি দেন তারা। কারও হাতে একটি, কারও হাতে একাধিক জ্বলন্ত মোমবাতি। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া পুণ্যার্থীদের কণ্ঠে ছিল প্রার্থনা সংগীত।

রাত ১১টার দিকে মা মারিয়ার মূর্তির সামনে নির্মিত বিশাল প্যান্ডেলে শুরু হয় বিশেষ প্রার্থনা। এরপর রাত ১২টায় নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিনের ধর্মীয় আচার। গতকাল সকাল ৮টায় ছিল জীবন্ত ক্রুশের পথ। ১০টার দিকে মহাখ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই তীর্থোৎসব।

ছবি: মিজানুর রহমান/সমকালপ্রার্থনায় শান্তি ও কল্যাণের প্রত্যাশা
চট্টগ্রাম থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তীর্থোৎসবে এসেছেন রিচিল মারাক। প্রতিবছরই তিনি এখানে আসেন। মা মারিয়ার কাছে মনের আশা পূরণের জন্য প্রার্থনা করেন। অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমাও চান। গত বছর যে আশা নিয়ে প্রার্থনা করেছিলেন, তা পূরণ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাজধানীর বনানী থেকে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন কলেজশিক্ষার্থী অনন্যা ক্লোরিডা। পড়াশোনা শেষ করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু করতে চান তিনি। সেই প্রত্যাশা নিয়েই প্রার্থনা করেছেন।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে এসেছেন ঘাসুড়িয়া সাংমা। তাঁর কাছে তীর্থস্থানে এলে এক ধরনের মানসিক শান্তি অনুভব হয়। পরিবারের জন্য প্রার্থনা করার পাশাপাশি প্রতিবছর পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দও রয়েছে।

তীর্থোৎসবের প্রধান পুরোহিত ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পল কুবি সিএসসি বলেন, ভক্তরা মা মারিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন। মানুষের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তি যেন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়– এ প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের প্রার্থনায়।

যেভাবে গড়ে উঠল তীর্থস্থান
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর খ্রিষ্টধর্মপল্লি। পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে গড়ে ওঠা এই ধর্মপল্লিকে ১৯৯৮ সাল থেকে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এখানে তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই ধর্মপল্লি এখন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর এ আয়োজনে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো পুণ্যার্থী আসেন। বিদেশ থেকেও আসেন অনেকে।

তীর্থোৎসবের সময় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলা বসে। সেখানে ধর্মীয় সামগ্রী, গারো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, চুড়ি-মালা, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, শোপিস ও শিশুদের খেলনা বিক্রি হয়। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষও মেলায় আসেন।

নালিতাবাড়ি পৌর এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, উৎসব উপলক্ষে মেলা বসে। আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ওই মেলায় যান। এই উপলক্ষে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এটি একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়।     

আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী মিশনের পালপুরোহিত রেভারেন্ড ফাদার তরুণ বনোয়ারী বলেন, আবহাওয়া ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তীর্থোৎসব উদযাপন করা হয়েছে। অন্য বছরের তুলনায় এবার পুণ্যার্থীদের উপস্থিতিও বেশি ছিল।

নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী 
তীর্থোৎসব ঘিরে নেওয়া হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জেলা পুলিশ, সাদা পোশাকের পুলিশ, এপিবিএন, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

শেরপুরের পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলাম জানান, চার শতাধিক পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পরিবেশে তীর্থোৎসব আয়োজনের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

মোমবাতির আলো, সম্মিলিত প্রার্থনা ও মানুষের মিলনমেলায় দুই দিনের এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। গারো পাহাড়ের পাদদেশে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের মিলন ঘটেছে এখানে। সৃষ্টি হয়েছে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির আবহ। 

আরও পড়ুন

×