চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড
এক বিষয়েই অকৃতকার্য ২৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী
রেকর্ড ১৫৫টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ২০ থেকে ৫০ শতাংশ
ফাইল ছবি
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:৩৫
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রকাশিত ফলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা খুব একটা ভালো করেননি। সব মিলিয়ে পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে বোর্ডটি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পেছনে আছে। এবারের পাসের হার বোর্ডে বিগত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সর্বশেষ ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এরপর থেকে আর কোনো বছরে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নামেনি। এবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে অর্ধেকের বেশি। এক বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছে রেকর্ড ২২ হাজার শিক্ষার্থী। ইংরেজি, গণিতসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে খারাপ হয়েছে। বেশি খারাপ করেছে ছাত্ররা। ফলে পিছিয়ে আছে তিন পার্বত্য জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। মানবিকের ফলেও হয়েছে ভরাডুবি। তিন প্রতিষ্ঠানের একজনও পাস করতে পারেননি। রেকর্ড ১৫৫টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার মাত্র ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসির ফল পর্যালোচনা করে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
শনিবার প্রকাশিত ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বোর্ডে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনা ভাইরাস-পরবর্তী ক্রান্তিকালে ২০২১ সালে পাসের হার ছিল রেকর্ড ৮৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০২২ সালে ছিল ৮০ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৭০ দশমিক ৩২ শতাংশ। অথচ এবার হয়েছে সর্বনিম্ন ফল। এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ২২ হাজার ১১৪ শিক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কলেজভিত্তিক ফলে ১৫৫টি প্রতিষ্ঠানের পাসের হার মাত্র ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। গত বছর এমন কলেজের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। ১০টি কলেজে পাসের হার ১০ শতাংশের মধ্যে, গত বছর ছিল ছয়টি। ২৭টি কলেজে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ পাসের হার। ৮২টি কলেজে ৫০ শতাংশের বেশি পাসের হার। যা গত বছর ছিল ৮৬টি।
পাঁচ বিষয়ে নাজুক ফল
এবার চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনে ২৮৩টি কলেজের ৯৬ হাজার ৩৩৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। ১১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিষয়ভিত্তিক ফলের দিক দিয়ে বেশির ভাগ বিষয়ে যেখানে পাসের হার ৯০ শতাংশের উপরে, সেখানে পাঁচটি বিষয়ে পাসের হার খুবই খারাপ। এর মধ্যে ইংরেজিতে সর্বনিম্ন ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, উচ্চতর গণিতে ৭০ দশমিক ২৩ শতাংশ, তথ্য ও প্রযুক্তিতে ৭৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ, হিসাববিজ্ঞানে ৮১ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং বাংলায় ৮৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
মানবিকে ভরাডুবি
বিভাগভিত্তিক ফলে মানবিক বিভাগে সর্বনিম্ন পাসের হার, মাত্র ৩৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সর্বোচ্চ, ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এই হার ৫৪ দশমিক ১৪।
তিন পার্বত্য জেলায় সর্বনিম্ন
চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবার পাসের হার ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ। অথচ অন্য জেলাগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে খাগড়াছড়িতে। এ ছাড়াও রাঙামাটিতে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ৩৩ দশমিক ২৪, বান্দরবানে ৪১ দশমিক ৪২ এবং কক্সবাজারে পাসের হার ৪৩ দশমিক ৩৪।
ছাত্রদের খারাপ ফল
পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে এবারও ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে ছাত্রীরা। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৪ হাজার ৬৭১ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ২৯ হাজার ৮২২ জন, পাসের হার ৫৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অথচ ৪১ হাজার ৬৬৪ ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ২০ হাজার ৩৪৪ জন, পাসের হার ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ।
জিপিএ ৫ কমেছে অর্ধেকের বেশি
এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে মাত্র দুই হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ৯৭ জন। ২০২৪ সালে ছিল ১০ হাজার ২৬৯ জন। দুই বছরের ব্যবধানে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি কমেছে। এবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী এক হাজার ৫৯৬ জন এবং ছাত্র এক হাজার ৩৩৩ জন।
তিন কলেজে সবাই ফেল
মেরন সান কলেজ থেকে দুজন, সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পাঁচজন এবং বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে দুজন শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের কেউ পাস করতে পারেননি। গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আটটি হলেও এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ছয়টিতে।
এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ এক বিষয়ে ফেল করেছে। এর মধ্যে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ফেলের হার সবচেয়ে বেশি। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাও খুব খারাপ ফল করেছে। ছাত্রীরা ভালো করলেও খুব খারাপ করেছে ছাত্ররা। মহানগরের প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করলেও পিছিয়ে আছে তিন পার্বত্য জেলার বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তিন প্রতিষ্ঠানের একজনও পাস করেনি। এসব কারণে ফল এবার খারাপ হয়েছে।
বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবদুল মান্নান বলেন, সত্যিকার অর্থে এখন বেশির ভাগ ছাত্র পড়ালেখায় অমনোযোগী। পড়ালেখার চেয়ে মোবাইল ফোন, আড্ডায় সময় বেশি ব্যয় করে তারা। এর ছাপ এবারের ফলে প্রমাণিত। ছাত্রীদের পাশাপাশি ছাত্ররাও ভালো করলে বোর্ডের সামগ্রিক ফল আরও ভালো হতো। এ জন্য মা-বাবাদের আরও সচেতন হতে হবে।
- বিষয় :
- এইচএসসি
- চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড
- ফেল