বরিশাল বোর্ডে ফল বিপর্যয়
পাঠ্যবই ও শ্রেণিকক্ষ বিমুখতা দায়ী, বলছেন শিক্ষকরা
সুমন চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:৪১
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিকে সবচেয়ে কম পাসের হার ছিল ২০০২ সালে। ওই বছর বোর্ডের ২৭ দশমিক ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছিলেন। ২০০৫ সাল থেকে পাসের হার ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যা ২০২১ সালে ৯৫ দশমিক ৭৬ শতাংশে পৌঁছায়। পরে নিম্নমুখী হয়ে শনিবার প্রকাশিত ফলে পাসের হার হয়েছে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যা দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বরিশাল বোর্ডের ফলের বিপর্যয় কেন হয়েছে এ নিয়ে সমকালের কথা হয়েছে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে, তাদের ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার উত্তরপত্র দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের মূল্যায়নের সারমর্ম হলো– গত দুই-তিন বছর ধরে শিক্ষার্থীরা এক রকম পাঠ্যবই বিমুখ। আর ছেলে শিক্ষার্থীদের বড় অংশই শ্রেণিকক্ষে যান না। চলতি বছর পরীক্ষা গ্রহণের সময় কেন্দ্রে কড়াকড়ি আরোপ করায় এসব শিক্ষার্থীরাই হোঁচট খেয়েছে।
বিষয়টির ব্যাখ্যা করেন মুলাদী সরকারি কলেজের আইসিটি শিক্ষক মনোজ কুমার মল্লিক। তিনি ২০০৮ সাল থেকে এইচএসসির উত্তরপত্র দেখছেন। এই শিক্ষক শনিবার বলেন, ‘এবারও কিছু পরীক্ষার্থীদের আচরণে দেখা গেছে– কেন্দ্রে মাস্তানি কিংবা মব করে বই দেখে লিখবেন! কিন্তু প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা এ ধরনের সুযোগই পাননি।’
এবার আইসিটিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হওয়া প্রসঙ্গে মনোজ মল্লিক বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির নিয়ম হলো, যে প্রশ্ন বিগত পরীক্ষায় একবার দেওয়া হয়েছে, পরে আর কোনো পরীক্ষায় ওই প্রশ্নপত্র আসবে না। নিয়মটি এ বছর থেকে কার্যকর হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেনি। তারা প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী গাইড বই ও টেস্ট পেপারে থাকা বিগত ৫ বছরের প্রশ্নের উত্তরগুলো আয়ত্ত করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু বিগত বছরের পরীক্ষায় কোনো প্রশ্নই এবারের প্রশ্নপত্রে রাখা হয়নি। যে কারণে যেসব পরীক্ষার্থী মূল বই পড়েছেন, তারা পাস করেছেন; যারা গাইড বই নির্ভরশীল তারা ধরা খেয়েছেন।
তিনি আরও জানিয়েছেন, আগে পরীক্ষকদের বোর্ড থেকেই বলা হতো, কমপক্ষে ২৮ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে পুনরায় নিরীক্ষণ করে ৩৩ দিয়ে পাস করানোর; কিংবা ৭৮ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে আরও দুই নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে জিপিএ ৫ পাইয়ে দেওয়ার। কিন্তু এ বছর বোর্ড থেকে এমন কোনো নির্দেশনা ছিল না।
২০০২ সাল থেকে এইচএসসি উত্তরপত্রের পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন মুলাদী সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক হাফিজ আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, আগে যেভাবে তারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতেন, এখনও একই নিয়মে করেন। কিন্তু বিগত দুই-তিন বছর ধরেই ছেলেদের পাসের হার ক্রমাগত কমছে। যদিও মেয়েদের পাসের হার প্রায় একই আছে। তাঁর ধারণা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছেলেরা পড়াশোনা বিমুখ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ বছর উত্তরপত্র মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, যারা লেখাপড়া করেন, তারা ঠিকই বেশি নম্বর পাচ্ছেন। এ বছরও তাঁর দেখা একটি উত্তরপত্রে বাংলা দ্বিতীয় পত্রে সর্বোচ্চ ৯২ নম্বর পর্যন্ত পেয়েছেন। অথচ ওই উত্তরপত্রের বান্ডিলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছেন।
উত্তরপত্র দেখায় প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা সহকারী অধ্যাপক পার্থ সারথী শর্মার। তিনি বরিশাল নগরীর অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ান। এ বছর বরিশাল বোর্ডে ফল বিপর্যয়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে পার্থ সারথী শর্মা বলেন, ইংরেজি বিষয়ে কোনো সময়ে আহামারি পাস ছিল না। কিন্তু মোট পাসের হার বেশি থাকায় ইংরেজিতে খারাপ করার বিষয়টি তখন দৃশ্যমান হয়নি। ফল বিপর্যয় প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, করোনা মহামারির পর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রেণিকক্ষ বিমুখতা বেড়েছে। গত দুই-তিন বছরে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ছেলে শিক্ষার্থীরা অনেকটা ক্লাস ছেড়েই দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এই ফলের মধ্যদিয়ে বিশেষ বার্তা রয়েছে বলে মনে করেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘পাস করতে হলে পড়তে হবে– এমন একটি বার্তা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আশা করি শিক্ষার্থীরা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে পড়ার টেবিলে ফিরবেন এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পাসের হার বৃদ্ধি পাবে।’
বোর্ড চেয়ারম্যানের মন্তব্য, মেয়েরা কেন ভালো করছেন, এ বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে ছেলে পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তাঁর মতে, আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকদের প্রতি নির্দেশনা থাকত, পাসের হার ও জিপিএ ৫ বাড়াতে হবে। এখনকার নির্দেশনা– উত্তরপত্রে যতটুকু লিখেছেন, ততটুকুই নম্বর দেওয়া হবে। পরীক্ষার্থী পাস করলেন কিনা, জিপিএ ৫ পেলেন কিনা, এসব বিবেচনায় আনা যাবে না।