ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

খানপুর কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে যানজটে শহর স্থবির হওয়ার শঙ্কা

খানপুর কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে যানজটে শহর স্থবির হওয়ার শঙ্কা
×
×

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নির্মাণাধীন খানপুর কনটেইনার টার্মিনাল। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে খানপুরে বিআইডব্লিউটিএ প্রায় ৬১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করছে। এই টার্মিনাল নির্মিত হলে নারায়ণগঞ্জ শহর যানজটে স্থবির হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই নাগরিক সংগঠনগুলো বিরোধিতা করে আসছে। কিন্তু এই বিরোধিতা উপেক্ষা করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উল্টো প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
নগরবাসীর অভিমত, যখন খানপুর কনটেইনার টার্মিনাল থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরের পানগাঁও টার্মিনালের সক্ষমতার ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ ও আট কিলোমিটার দূরের মুক্তারপুরের সামিট অ্যালায়ান্স পোর্টের সক্ষমতার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। তখন এই টার্মিনাল একদমই অপ্রয়োজনীয়।

খানপুর কনটেইনার টার্মিনাল সিটি করপোরেশনের অনাপত্তিও পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান আওয়ামী লীগ আমলে তাঁর নিজস্ব লোককে কাজ পাইয়ে লাভবান হতে অপ্রয়োজনীয় এই প্রকল্প নিয়েছিলেন। সরকার পতন হলেও সেই একই ঠিকাদার সরকারের ওপর মহলকে ম্যানেজ করে প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছেন।
খানপুরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের পাশ দিয়ে যেতে হয় এই টার্মিনালে। হাসপাতাল থেকে কয়েকশ গজ দূরেই নির্মিত হচ্ছে টার্মিনালটি। এই রাস্তাটি এতটাই সরু যে দুটি বড় ট্রাক পাশাপাশি গেলে তাদের গতি ধীর করতে হয় দুর্ঘটনা এড়াতে। টার্মিনাল নির্মিত হলে এই রাস্তা দিয়েই আসা-যাওয়া করবে কনটেইনারবাহী ২০ চাকার লম্বা যানবাহনগুলো। প্রকল্পের কাগজপত্রে বলা হয়েছে– চট্টগ্রাম, মোংলা ও অন্যান্য বন্দর থেকে সরাসরি অভ্যন্তরীণ নৌপথে কনটেইনার পরিবহন সহজ করা এবং বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের অধীনে উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে, ট্রানজিট সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু টার্মিনাল থেকে যানবাহনগুলো মহাসড়ক বা প্রশস্ত আঞ্চলিক সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে কীভাবে তা উল্লেখ নেই প্রকল্পের নকশায়।
খানপুরের কনটেইনার টার্মিনালের প্রথম সংশোধিত প্রকল্পটি ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ পিপিপির আওতায় প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর এটি একনেকে অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তখন প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৯২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৬১৫ কোটি টাকা। এবার আবার এটির প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

গতকাল শনিবার টার্মিনালস্থলে গিয়ে শোনা গেল ভারী যন্ত্রপাতির শব্দ; ভেতরে কাজ চলছে। তবে সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই বলে জানালেন গেটে থাকা প্রহরী আব্দুস সালাম। তিনি জানান, বিআইডব্লিউটিএ বা কাজের ঠিকাদারের অনুমতি নিয়ে আসতে হবে।
তবে শুরু থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে নগরবাসী। নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, নির্মাণাধীন কনটেইনার পোর্ট থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে নারায়ণগঞ্জ সরকারি ৩০০ শয্যা হাসপাতাল। যেটি ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ চলমান। তার পাশেই কুমুদিনীর প্রস্তাবিত ক্যান্সার হাসাপাতাল। টার্মিনালের আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে বার একাডেমি স্কুল, নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল চাষাড়া শহীদ মিনার, বিশাল সব শপিংমল ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কার্যালয়, তোলারাম কলেজ, মহিলা কলেজ। এক কিলোমিটারের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল, নারায়ণগঞ্জ কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠান। এমনিতেই শহরজুড়ে প্রতিনিয়ত মানুষকে তীব্র যানজটে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। তার ওপর কনটেইনার পোর্ট নির্মাণ হলে নারায়ণগঞ্জ শহর স্থবির হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই টার্মিনালটির বিরোধিতা করছি। এটি আওয়ামী লীগ সরকারের মেগা প্রকল্পের নামে মেগা লুটপাটের আয়োজন ছাড়া আর কিছুই না। বর্তমান সরকারের উচিত ছিল এটি বাতিল করা। কিন্তু তা না করে এই লুটপাটের প্রকল্প তারাও এগিয়ে নিচ্ছে।’

সম্প্রতি এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরাম। তারা এর বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী, জেলা প্রশাসক, সিটি প্রশাসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে স্মারকলিপি দিয়েছে। মানববন্ধন, সমাবেশ, মিছিল করেছে। নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর নাব্য এবং পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে যাচাই না করেই কনটেইনার পোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে শীতলক্ষ্যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচল ব্যাহত হবে। নারায়ণগঞ্জ শহরে যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ বাড়বে। এটি বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হবে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মঈনুল ইসলামের ভাষ্য, বিআইডব্লিটিএর কনটেইনার পোর্ট নির্মাণ করার কারণে নগরীতে যানজট আরও বাড়বে। এই টার্মিনাল নির্মাণের ফলে প্রতি ঘণ্টায় নতুন করে কমপক্ষে শতাধিক ভারী যানবাহন নগরীর রাস্তায় চলবে। সে সব যানবাহন ধারণের সক্ষমতা টার্মিনালের আশপাশের রাস্তায় আছে কিনা সেটা নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আওয়ামী লীগ আমলের একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এটির সঙ্গে একমত নন তারা। এই প্রকল্পের জন্য তাদের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মিজানুর রহমানের ভাষ্য, এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানতে হলে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন। এটি বলে তিনি ফোনকল কেটে দেন। পরে প্রকল্প পরিচালক নিজাম পাঠানের মোবাইল ফোনে কথা বলতে কল দেওয়া হলেও ধরেননি তিনি।

আরও পড়ুন

×