কোটি টাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ধস
বরগুনার তালতলী উপজেলার পায়রা নদীতে ধসে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একাংশ। গত বুধবার দুপুরে উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামে সমকাল
আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরগুনার তালতলীতে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারের মাত্র দেড় মাসের মাথায় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে পড়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলা, দায়সারা কাজ এবং তীর থেকে মাটি তুলে সংস্কার করার কারণেই এই ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বাঁধটি ধসে পড়ায় ১৫টি গ্রামের মানুষ ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলবাড়িয়া-নলবুনিয়া এলাকায় চলতি বছর ৫টি প্যাকেজের আওতায় ৫৯০ মিটার বাঁধ সংস্কার ও জিওব্যাগ ফেলার জন্য ১ কোটি ৪৭ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার।
সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পায় বরগুনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পপুলার কনস্ট্রাকশন, মেসার্স আর.এস কনস্ট্রাকশন, মেসার্স মনি ট্রেডার্স এবং বরিশালের মেসার্স সোহেল এন্টারপ্রাইজ। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাঁধের সংস্কারকাজ শুরু হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। কিন্তু কাজ শেষের মাত্র দেড় মাসের মাথায় গত রোববার জোয়ারের সময় প্রায় ৩০০ মিটার এলাকাজুড়ে সংস্কার করা বাঁধ জিওব্যাগসহ পায়রা নদীতে ধসে পড়ে। এ ছাড়া আরও ২০০ মিটার বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বাঁধটি সংস্কার করা না হলে যে কোনো মুহূর্তে তা সম্পূর্ণ ভেঙে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়বে। এতে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলবাড়িয়া, বড় অঙ্কুজানপাড়া, নলবুনিয়া, আগাপাড়াসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, আমন ধান ও মাছের ঘের তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দায়সারা তদারকির কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভেকু (এক্সক্যাভেটর) দিয়ে বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন নদীর তীর থেকেই মাটি খনন করে বাঁধ নির্মাণ করায় মাত্র দেড় মাসের মধ্যে তা ধসে পড়েছে। এ ছাড়া জিও ব্যাগগুলোতে নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ বালুভর্তি করার কথা থাকলেও, নামমাত্র বালু ও মাটি ভরে বাঁশের খুঁটি ও টিনের বেড়া দিয়ে তা ডাম্পিং করা হয়েছে।
তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্বাস আলী বলেন, ‘বাঁধ উইভাঙ্যা গেলে মোদের ঘরবাড়ি, ধানখেত সব তলাইয়া যাইবে। মোদের ধান নষ্ট অইয়া গেলে হারা বছর মোরা কী খামু, হেই চিন্তায় আছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাবুল হাওলাদার, মো. হাসান মিয়া ও মো. নুর-আলম মাতুব্বর অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছরই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দায়সারাভাবে বেড়িবাঁধ মেরামত করে, যে কারণে বারবার বাঁধ ধসে পড়ে। কাজ শুরুর সময় তারা অনিয়মের প্রতিবাদ জানালেও কর্তৃপক্ষ কোনো কর্ণপাত করেনি। এখন জিও ব্যাগগুলো নদীতে ধসে পড়ছে এবং বাঁধে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোনো সময় বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করলে ১৫টি গ্রাম তলিয়ে যাবে এবং তারা গুরুতর বিপদে পড়বেন।
বেড়িবাঁধে ভাঙন ও ধসের ঘটনায় মেসার্স সোহেল এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স মনি ট্রেডার্স-এর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অপর দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পপুলার কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী লিমন জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি নেই। যে জায়গাটিতে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেটি আসলে একটি নদীর মোহনা। মোহনার এই জটিল প্রকৃতির কারণে সেখানে বারবার ভাঙনকবলিত হচ্ছে। তাই নদীর এই পয়েন্টে স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা ছাড়া ভাঙন রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অন্যদিকে আংশিক দায় স্বীকার করে মেসার্স আর.এস. কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী রাসেল জানান, বাঁধের একটি অংশে ধসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এক সপ্তাহের ভেতরে ফের সংস্কারকাজ করা হবে।
বরগুনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, নদীভাঙন রোধে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলবাড়িয়া-নলবুনিয়া এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে নদীর তলদেশ থেকে ভাঙন শুরু হওয়ায় শুধু জিওব্যাগ ফেলে আপাতত বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি নদীর তীর থেকে মাটি তুলে সংস্কারের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এই এলাকায় সিসি ব্লক ও জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে বৈদেশিক অর্থায়ন চেয়ে প্রধান কার্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি, তা দ্রুত পাস হবে।
- বিষয় :
- বন্যা