হাওরের কান্না (৩)
পাথরখেকোদের 'বোমা মেশিনে' বাড়িঘরও ধ্বংস
জাহিদুর রহমান, হাওরাঞ্চল থেকে ফিরে
প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ | ২২:১২
সুনামগঞ্জের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা যাদুকাটা নদীর
নামের 'উৎস' জানালেন বৃদ্ধ ইকবাল হোসেন। লোককথায় প্রচলিত কাহিনি তুলে ধরে
নদীতীরের এ বাসিন্দা বলেন, 'যাদুকাটার আদি নাম রেণুকা। নদীতীরবর্তী কোনো এক
গাঁয়ের বধূ তার শিশুপুত্র যাদুকে কোলে নিয়ে এই নদীর মাছ কাটছিলেন। এক
পর্যায়ে অন্যমনস্ক হয়ে মাছের পরিবর্তে কোলের শিশুকে কেটে ফেলেন। সেই থেকে
এর নাম হয় যাদুকাটা।'
যাদুকাটা নামের এই মর্মান্তিক 'ইতিহাস' সত্য হোক আর না হোক, এখানে এখনও
চলছে নির্মম সব ঘটনা। যাদুকাটার পারে শিমুল বাগানে বসে কথা হয় স্থানীয় কিছু
মানুষের সঙ্গে। হাতের ইশারায় কাটা পাড় দেখিয়ে আব্দুল হান্নান নামে এক
বৃদ্ধ বলেন, 'ওইখানে আমার দুই একর জায়গা ছিল। ৪০ বছর এখানে বাস করেছি।
কিন্তু মাস তিনেক আগে আমার ঘরসহ পুরো জমি কেটে নিয়ে যায় প্রভাবশালীরা।
বিচার চেয়েও পেলাম না, উল্টো মামলার হুমকি পাচ্ছি।'
সুনামগঞ্জের নোয়াপাড়ার পল্লি চিকিৎসক তোয়াজ আলী বলেন, 'সন্ত্রাসী মোশাহিদ
বাহিনীর নুরুজ আলী মেম্বার, মনির উদ্দিন, হবিবুল হক, সামছুজ্জামান ও জসিম
উদ্দিন আমার জমি কেটে নিয়ে গেছে।'
রইস মিয়ার এক একর ৩৪ শতাংশ জমি কেটে নেয় একই বাহিনী। নাজিম উদ্দিনের এক একর
জায়গা কেটে নিয়েই প্রভাবশালীরা ক্ষান্ত হয়নি, তাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে
দেড় মাস জেলও খাটিয়েছে। জমাদুর রহমানের দুই একর পৈতৃক সম্পত্তি কেটে নিয়ে
গেছে সন্ত্রাসীরা। বিজিবির সাবেক এক কর্মকর্তার চার একর জমিও কেটে নেয়
প্রভাবশালীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক হয়েও রক্ষা করতে পারেননি কষ্টে কেনা
জমি।
সব হারানো নিঃস্ব এসব মানুষের কথা যেন শেষই হচ্ছিল না। তারা জানান, নিয়ম
অনুযায়ী শুধু নদীর মাঝ থেকে বালু-পাথর উত্তোলনের কথা থাকলেও পাড় কেটে নিয়ে
যাওয়া হচ্ছে। প্রভাবশালীদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ফসলি জমি এবং
বাড়িঘরও। বোমা মেশিন ব্যবহার করে এক রাতেই এক একটি গ্রাম নিঃশেষ করে দেওয়ার
ঘটনা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছে এখানকার মানুষ। যাদুকাটার চারপাশে এখন শুধুই
ক্ষতচিহ্ন। জমির নিচে পাথর থাকায় বাড়ি ও জমিতে ছোট-বড় গর্ত করে পানি সেচে
অবৈধভাবে উত্তোলন হচ্ছে পাথর।
জানা গেছে, বোমা মেশিন দিয়ে ভূগর্ভ থেকে পাথর তোলা হয়। এটাকে ড্রেজারও বলা
হয়। এটা মূলত পাওয়ার পাম্প আর পাইপ দিয়ে তৈরি। এই যন্ত্র দিয়ে পাথর তোলার
সময় বোমার মতো শব্দ হয় বলে নাম রাখা হয়েছে বোমা মেশিন। মাটির ১৫০ ফুট গভীর
থেকে এটি পাথর তুলতে পারে। কিন্তু বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করলে
আশপাশের ভূমি ধসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর বদলে গিয়ে
ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
সংশ্নিষ্টরা জানান, যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী অনেকেই প্রভাবশালীদের কাছে
ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরছেন। প্রতিবাদ করতে গেলেই নেমে আসে
মামলা-হামলা। টেকেরগাঁও গ্রামের মজিবুর রহমান প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের
বাড়িটাই হারিয়েছেন। তার বসতঘর পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে সেখানে বসবাস করছেন
হবিবুল হক নামে এক প্রভাবশালী। সে বাড়ির ভেতরেই পাওয়া যায় হবিবুল হককে। কথা
বলার এক পর্যায়ে তিনি সটকে পড়েন। জমি ও বসতঘর কাটার অভিযোগ যে মোশাহিদ
তালুকদারের বিরুদ্ধে, তার বাড়ি বাঁশপাড়া গ্রামে। তিনি সেখানে গড়ে তুলেছেন
আলিশান বাড়ি। তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে ফোন করার পর তিনি রীতিমতো
নিজেকে ধোয়া তুলসী পাতা প্রমাণের চেষ্টা করেন। জমি ও বসতভিটা কেটে মানুষকে
উচ্ছেদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এসব তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তাহলে কারা
মানুষকে পথে বসিয়েছে- এ প্রশ্ন করতেই তিনি ফোন কেটে দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি
যাদুকাটা-তীরবর্তী ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোশারফ হোসেন তালুকদারের
প্রভাবে তার ভাই মোশাহিদ তালুকদার, তার ছেলে মুনায়েম হোসেন রাজু ও ফুফাতো
ভাই রহিমুদ্দিন নদীর পাড় কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ
প্রতিবাদ করলে মামলার ভয় দেখান মোশারফ। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য
মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের ঘনিষ্ঠ। সেই শক্তিতে মোশাহিদ নির্বিঘ্নে অপকর্ম করে
যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগও
দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রতনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয়
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে অভিযোগ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, যাদুকাটা নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করা নৌকা থেকে পাঁচ
থেকে আট হাজার টাকা হারে টোল আদায়ের মাধ্যমে দিনে অন্তত ৫০ লাখ টাকা আদায়
করা হচ্ছে স্থানীয় সাংসদ রতনের নামে। ২০০৮ সাল থেকে রতন শক্তিশালী
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ নিচ্ছেন। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য রতন বলেন, 'এক
লাখ টাকার পাথর কোয়ারি যারা ছয় কোটি টাকায় লিজ নিয়েছে, তারা তো তাদের টাকা
তুলবেই। তবে অবৈধ চাঁদাবাজি যে একেবারেই হয় না, তা ঠিক নয়। কিন্তু চাঁদাবাজ
ও চোর-ডাকাত তাড়ানোর দায়িত্ব আমার নয়।' নিজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার
করেন তিনি।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পরিবেশ
আইনজীবী সংস্থার (বেলা) এক রিটে হাইকোর্ট যাদুকাটা নদীর তীর কাটা বন্ধের
নির্দেশ দেন। তা সত্ত্বেও শ্রমিকদের রুটি-রুজির দোহাই দিয়ে নদীর পাঁচটি
স্পটে বোমা মেশিন দিয়ে পাড় কেটে বালু-পাথর উত্তোলন করছে প্রভাবশালীরা।
তাহিরপুর উপজেলার বিজিবি ক্যাম্পের পাশে লাউড়েরগড় এলাকার ধু-ধু বালুচরেও
ধ্বংসযজ্ঞ চলছে দিনরাত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জানান, স্থানীয় জামাল
মিয়া, রানু মিয়া, মজিবুর রহমান, মজিবুর, রহিমুদ্দিন, সাত্তার মিয়া,
মোশাহিদের ম্যানেজার সিদ্দিকুর রহমান, নাছির উদ্দিন, জসিম উদ্দিন,
সামছুজ্জামান, নুরুজ আলী, তাওহিদ, হাবিকুল ও রবিউলের নেতৃত্বে প্রায় ৫০
জনের একটি দল এখানে চাঁদাবাজি করছে। পাথর উত্তোলনের প্রতিটি বোমা মেশিন
থেকে দুই হাজার এবং প্রতি বর্গফুট বালু থেকে দুই টাকা করে চাঁদা তুলছে
তারা। এ চক্র বালু-পাথরবোঝাই নৌযান থেকেও চাঁদা নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগে রহিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ
করেছেন শহিদুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, বোমা মেশিনে
পাথর উত্তোলনের ফলে কয়েকটি গ্রাম ও শত শত একর জমি বিলীন হয়ে গেছে। এতে
চাষের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি। সরকারের উচিত আইন বাস্তবায়ন করা।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পীযূষ পুরকায়স্থ টিটু বলেন,
সনাতন পদ্ধতিতে নদীর মাঝ থেকে হাতে বালু ও পাথর তুললে শ্রমিকদের লাভ হতো,
পরিবেশও রক্ষা পেত।
- বিষয় :
- হাওরের কান্না