বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস আজ
চিকিৎসা চালাতে নিঃস্ব হচ্ছেন রোগী-স্বজন
প্রতীকী ছবি
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৩ | ১০:৩৮
দিনমজুর কিবরিয়া মাতুব্বর থাকেন মাদারীপুর সদরের একটি ভাড়া বাসায়। তার ১১ বছরের ছেলে মো. সোহান রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। কিবরিয়া বলেন, তিন বছর বয়সে ছেলের থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত হয়। ৭ থেকে ৮ বছর ধরে চিকিৎসা করে আসছি। প্রতি মাসে দু’বার রক্ত দিতে হয়। সেই সঙ্গে অনেক ওষুধ কিনতে হয়। সব মিলিয়ে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার খরচ। মাঝেমধ্যে টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়। তখন সোহান অনেক দুর্বল হয়ে যায়। ছেলের অসুস্থতা বাড়লে বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা বাড়ে। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে ফের চিকিৎসা শুরু করি। এরই মধ্যে নিজের জায়গাজমি বিক্রি করতে হয়েছে। এভাবে কতদিন চিকিৎসা চালিয়ে নিতে পারব জানি না।
রাজধানীর বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নুসরাত জাহানও থ্যালাসেমিয়া রোগী। ২২ বছরের নুসরাত দুই বছর বয়স থেকে এ রোগ বহন করছেন। প্রতি মাসে দু’বার হিসাবে গত ২০ বছরে প্রায় ৪৮০ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে তাঁকে। রক্ত জোগাড়ে প্রতিবারই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে শরীরে নানা জটিলতাও দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। পা ও হাতের হাড় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাইয়েরও থ্যালাসেমিয়া রয়েছে। নুসরাত জানান, সবচেয়ে বেশি কঠিন রক্তের ব্যবস্থা করা। প্রতি মাসে চার ব্যাগ রক্ত লাগে তাঁদের। প্রতিদিনই ডোনার খুঁজতে হয়।
শুধু সোহান বা নুসরাত নন, থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন লাখো রোগী ও তাঁর স্বজন। তাঁদের আকুতি, দেশের সব স্থানে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা সহজ এবং বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।
তবে দেশে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসায় রয়েছেন মাত্র ১৩৫ রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতালের সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের শতকরা ১২ ভাগ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের জিন বহন করছে। এ হিসাবে দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ এর বাহক। প্রতি বছর আরও ৫ থেকে ৬ হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। যে হারে রোগী বাড়ছে, সেই হারে বাড়েনি সেবার মান। চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত গ্রামের রোগীরা।
এ অবস্থায় আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘থ্যালাসেমিয়া : নিজে জানি, যত্নবান হই, অপরকে সচেতন করি।’ এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসকারিভাবে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীকে প্রতিনিয়িত অন্যের দান করা রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। তবে দেশে এখনও নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে রোগীরা নিয়মিত রক্ত নিলেও অনেক ধরনের সমস্যা হয়। বেশিরভাগ থ্যালাসেমিয়া রোগীর মৃত্যু হয় পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশনের (অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন) মাধ্যমে এ রোগ থেকে মুক্তি মেলে। ৮০ শতাংশ রোগী ভালো হয়। তবে সেই চিকিৎসা ব্যবস্থাও দেশে গড়ে ওঠেনি। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনে ২০১৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি কেন্দ্র চালু হয়। সেখানে এ পর্যন্ত ৫২ জনের অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা হলেও তাঁদের কেউ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত নন। বেসরকারিভাবে দেশে মাত্র দু্’জন থ্যালাসেমিয়া রোগীর অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে।
ঢামেক হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. অখিল রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা ব্যয়বহুল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ চিকিৎসা চালাতে হয়। তবে অধিকাংশ রোগী ৫ থেকে ১০ বছর চিকিৎসা নিয়ে অর্থ সংকটে বন্ধ করে দেয়। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনও ব্যয়বহুল। অটোলোগাস পদ্ধতিতে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনে ৫ লাখ টাকা এবং অ্যালোজেনিক পদ্ধতিতে এর প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু চিকিৎসাপ্রার্থীরা দরিদ্র হওয়ায় তাঁদের পক্ষে এ ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। এ জন্য সরকারের এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতালের সভাপতি ডা. এম এ মতিন বলেন, তাঁদের সমিতির আওতায় প্রায় ৯ হাজার নিবন্ধিত রোগী রয়েছেন। তাঁদের জন্য বছরে ২ লাখ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন। তবে তাঁরা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার ব্যাগ সংগ্রহ করতে পারছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, দেশে চাহিদার মাত্র ৩১ শতাংশ রক্ত সংগ্রহ করা হয় স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে। যে রোগীদের নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন করতে হয়, তাঁদের প্রতি মাসে ১ থেকে ৪ ব্যাগ রক্ত লাগে। ৮০ শতাংশ পরিবার নিয়মিত রক্ত জোগাড়ে সমস্যায় পড়ে। দেশে বহুল পরিচিত ব্লাড ডোনার ক্লাব ও সংস্থা থেকেও তাঁরা আশানুরূপ সহযোগিতা পান না।
ডা. এম এ মতিন জানান, শরীরে রক্ত পরিসঞ্চালন ও তিন ধরনের ওষুধ ব্যবহারের ওপরই দেশে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা নির্ভরশীল। তবে সরকারিভাবে বিনামূল্যে ওষুধের ব্যবস্থা না থাকায় উচ্চমূল্যের ওষুধ কিনে দরিদ্রদের পক্ষে চিকিৎসা চালানো কষ্টসাধ্য। এতে চিকিৎসা ছাড়াই অধিকাংশ রোগী মারা যান।
- বিষয় :
- থ্যালাসেমিয়া
- বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস
