ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

জাতীয় দলিত কনভেনশন

দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার ও অন্তর্ভুক্তির দাবি

দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার ও অন্তর্ভুক্তির দাবি
×

‘জাতীয় দলিত সম্মেলন ২০২৫’

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৫ | ০৫:০৮ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৫ | ১৭:০৮

দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের অধিকার ও সুশাসনের জন্য নিবেদিত সংস্থা ‘দলিত’-এর আয়োজনে সোমবার রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জাতীয় দলিত সম্মেলন ২০২৫’। ইসলামিক রিলিফ সুইডেনের অর্থায়নে আয়োজিত এ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক দলিত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের অধিকার, অন্তর্ভুক্তি ও বঞ্চনার বিষয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা তুলে ধরা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘দলিত’-এর নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার দাস স্বাগত বক্তব্যে দলিত সম্প্রদায়ের বাস্তব বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি সংসদে দলিত নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যবিলোপ আইন বাস্তবায়নের দাবি জানান। ‘দলিত’-এর স্বেচ্ছাসেবক মনা দাস সম্মেলনের মূল প্রবন্ধে ১২টি দাবি উত্থাপন করেন এবং সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনের বাস্তবতা অনুধাবনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন ও বিচার বিভাগের উপসচিব ড. আবুল হাসানাত বলেন, ‘দেশ গরিব নয়, বরং অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।’ তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘যথাযথ সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক কল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজের নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নিবেদিত। আমাদের দায়িত্ব হলো সমাজের দুর্বল মানুষদের রক্ষা করা।’

প্যানেল আলোচনায় বহুমাত্রিক দাবি উত্থাপিত হয়। ‘নীতিমালা ও অনুশীলনে দলিত অধিকার’ শীর্ষক এ আলোচনায় বিভিন্ন বক্তা দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরেন। আবুল হাসানাত জানান, ‘এন্টি-ডিসক্রিমিনেশন অ্যাক্ট ২০১৮’-এর খসড়া প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রস্তাবিত সুপারিশসমূহ তিনি মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করবেন। 

বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের প্রধান সীমা দাস হরিজন ও দলিত নারীদের নেতৃত্বে আনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. দেবাশিষ কুমার কুন্ড প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি কৃষ্ণ লালা ‘আইন আছে, কিন্তু চর্চা নেই’– এই অভিব্যক্তি দিয়ে আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্বপন কুমার দাস যুব সমাজকে সংগঠিত করার চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন এবং সিবিও গঠনের মাধ্যমে দলিতদের সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

সম্মেলনে কয়েকজন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিও সংহতি বক্তব্য রাখেন। ইতালির রাষ্ট্রদূত এইচ ই আন্টোনিও আলেসান্দ্রে এই সম্মেলনের মাধ্যমে দলিতদের কণ্ঠস্বর উত্থাপনের প্রশংসা করে বলেন, ‘আইন প্রয়োগে বাস্তবতা ও সংস্কৃতির সংযোগ জরুরি।’ জিআইজেড-এর মার্টিনা বার্কার প্রবেশাধিকার ও আইন প্রণয়নে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। জার্মান ডক্টরস-এর গোর্কি গৌরাব দলিতদের পুষ্টি ও ফলন বিষয়ে কাজ করা এবং একটি যৌথ ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দেন। দলিত সংগঠক পংকজ বাসফোর দলিতদের জন্য পুনর্বাসনের দাবি তুলে ধরেন। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ নুজহাত জাবিন স্থানীয় দলিত সংগঠনগুলোর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

সম্মেলনে দলিত জনগোষ্ঠী যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেই চিত্র উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে– শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য এবং ঝরে পড়ার হার; স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যমূলক আচরণ; ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থায়ী কর্মসংস্থান; আবাসন সংকট এবং উচ্ছেদের ভয়; সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে থাকা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত তথ্যই জানে না।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শাহবাগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলনের (বিডিওআরএএম) বারো দফা দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল– ‘বৈষম্য বিলোপ আইন, ২০২২’ দ্রুত পাস করা, উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা।

সম্মেলনে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা বলেন, উত্থাপিত দাবি ও সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের পথে এগোবে– যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবে।
 

আরও পড়ুন

×