বিশ্বে সস্তা হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পিছিয়ে বাংলাদেশ
আইআরইএনএর প্রতিবেদন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৫ | ১৬:৩৩ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৫ | ২১:৩৬
বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়সাশ্রয়ী বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইআরইএনএ)। তবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল ও মূলধন সংকটে থাকা দেশগুলোতে এ অগ্রগতি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বুধবার প্রকাশিত ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ব্যয় ২০২৪’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে চালু হওয়া নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ৯১ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানির যে কোনো বিকল্পের তুলনায় কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। গত বছর সারাবিশ্বে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫৮২ গিগাওয়াট বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে প্রায় ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। স্থলভাগে বায়ুবিদ্যুৎ বর্তমানে সবচেয়ে সাশ্রয়ী, প্রতি ইউনিটে মাত্র ০.০৩৪ মার্কিন ডলার এবং সৌর পিভি বিদ্যুৎ গড়ে ০.০৪৩ ডলার।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম প্রতিবেদনে বলেন, বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ কমছে। তবে এ হার তুলনামূলকভাবে ধীর। এর মূল কারণ জমির উচ্চমূল্য, জটিল অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ও সঞ্চালন ব্যয়।
তিনি জানান, ‘বিশেষ বিদ্যুৎ আইন, ২০১০’ স্থগিত হওয়ার আগে ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুতের সর্বশেষ দর ছিল প্রতি ইউনিট ০.০৯৮৫ মার্কিন ডলার। সরকারি জমি বরাদ্দ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ট্রান্সমিশন খরচ কভার করা গেলে ব্যয় আরও কমানো সম্ভব। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আইআরইএনএর রিপোর্টে বলা হয়েছে, গ্লোবাল সাউথ, যেমন– এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল বিদ্যুৎ গ্রিড অবকাঠামো, উচ্চ মূলধন ব্যয়, অর্থায়নে সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতা।
শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দরপত্রে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ থেকেই বোঝা যায়, আস্থা ফেরাতে হবে। দরপত্রে বাস্তবায়ন চুক্তি পুনঃস্থাপন এর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
আইআরইএনএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রকল্পের বড় অংশের ব্যয়ই হয়ে যাচ্ছে ঋণের সুদ ও অর্থায়নে, যা বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপ ও আফ্রিকায় উইন্ড বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ একই হলেও আফ্রিকায় অর্থায়ন খরচই প্রকল্প ব্যয়ের প্রধান অংশ।
প্রতিবেদনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, পরিষ্কার জ্বালানিই এখন স্মার্ট অর্থনীতি। কিন্তু যদি গ্রিড উন্নয়ন, প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা না হয়, তবে নবায়নযোগ্য বিপ্লব উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যাবে।
আইআরইএনএর মহাপরিচালক ফ্রান্সেসকো লা ক্যামেরা বলেন, ২০২৪ সালে নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোর কারণে প্রায় ৪৬৭ বিলিয়ন ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানির খরচ এড়ানো গেছে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে গ্লোবাল সাউথে অর্থায়ন, নীতিমালা এবং অবকাঠামোতে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে ব্যাটারি সংরক্ষণের খরচ ২০১০ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে এসে ৯৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে।
২০২৫ সালের মধ্যে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় বলে মন্তব্য করেছেন শফিকুল আলম।
- বিষয় :
- জ্বালানি
- জীবাশ্ম জ্বালানি
