পৃথক সচিবালয়ের পরও বিচারকের কাজ করবেন ২৫% আমলা
.
দেলওয়ার হোসেন
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ | ০১:১১ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৫ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পরও আইন ও বিচার বিভাগে কাজ করবেন প্রশাসন ক্যাডারের ২৫ ভাগ কর্মকর্তা। অধস্তন আদালতে নতুন পদ সৃষ্টি করতে গঠন করা হবে পৃথক কমিটি। জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদগুলো করা হয়েছে ক্যাডারের পদ। এমন বিধান রেখে সোমবার রাতে আইন ও বিচার বিভাগে পদায়ন বিধিমালা এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথক্করণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আইন ও বিচার বিভাগে পদায়ন বিধিমালার ৪ ধারায় বলা হয়েছে, আইন ও বিচার বিভাগে ২৫ ভাগ পদে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যবহির্ভূত প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবদের নিয়োগ করা যাবে। বাকি ৭৫ ভাগ পদে নিয়োগ পাবেন জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সঠিক বাস্তবায়ন দাবি
জুডিশিয়াল সার্ভিসের দুই বিধিমালার বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বাসা) সভাপতি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গত সোমবার এ বিষয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমরা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সঠিক বাস্তবায়ন চাই। এই মামলার রায়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রশাসনিক কাজ থেকে পৃথক থাকবে। বিষয়টি ভালোভাবে পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ জন্য অ্যাসোসিয়েশনের আইন কমিটি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। আইনগত দিকও তারা দেখছে।
নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১১১/২০০৮ ও ১১২/২০০৮ নম্বর সিভিল আপিলে প্রদত্ত রায়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন সচিব পদসহ অন্যান্য পদে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের নিয়োগের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই আইন ও বিচার বিভাগের সচিব পদসহ বিভিন্ন পদে জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের নিয়োগ করা হয়। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আইন ও বিচার বিভাগে পদায়ন বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। একই সঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগের বিধিমালা-২০০১ রহিত করা হয়েছে।
প্রশাসন ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি জুডিশিয়াল সার্ভিস পৃথক হওয়ায় তারা নির্বাহী বিভাগের সব কার্যক্রম থেকে পৃথক থাকবে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগ হলো প্রশাসনিক বিষয়– এটা প্রশাসনের কর্মকর্তারাই দেখবেন। কিন্তু পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্যে জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তারা এই বিধিমালা পরিকল্পিতভাবে জারি করেছেন।
সাবেক জেলা জজ শাহজাহান সাজু সমকালকে বলেন, সুষ্ঠু বিচার প্রশাসন পরিচালনার পৃথক সচিবালয় এবং আইন ও বিচার বিভাগের জন্য শুধু বিচার বিভাগের লোকজন থাকা প্রয়োজন। এখানে প্রশাসনের লোকজন থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। মাসদার হোসেন মামলার রায়ে বলা আছে– সুষ্ঠু বিচার কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে জুডিশিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তারা মিশতে পারবেন না।
জুডিশিয়াল সার্ভিস হলো ক্যাডার পদ
জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালায় বলা হয়েছে– তপশিলে উল্লিখিত পদ হবে সার্ভিসের ক্যাডার পদ। ২০০৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (গঠন, নিয়োগ, সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালায় শুধু তপশিলে উল্লিখিত পদ বলা হয়েছিল।
অধস্তন আদালতের পদ সৃষ্টিতে পৃথক কমিটি
নিম্ন আদালতে বিচারকের নতুন পদ সৃষ্টিতে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতির সভাপতিত্বে পদ সৃজন কমিটি গঠিত হবে। বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের কর্মে জ্যেষ্ঠ বিচারপতির সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন, হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিবদের সমন্বয়ে বিচারিক পদ সৃজন কমিটি গঠিত হবে। ওই পদ সৃজনের ক্ষেত্রে কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। সার্ভিসের পদ সৃজনের ক্ষেত্রে বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষেত্রে বিচারিক পদ সৃজন কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে আইন ও বিচার বিভাগ রাষ্ট্রপতির কাছে সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করবে এবং অনুমোদিত সারসংক্ষেপ অনুযায়ী চূড়ান্ত আদেশ জারি করবে। এর আগে ২০০৭ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস গঠন, সার্ভিস পদে নিয়োগ এবং সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়।
সহায়ক পদ সৃষ্টি করবে জনপ্রশাসন
বিচারিক পদের সহায়ক জনবল সৃজন এবং বিচারিক পদের অফিস সরঞ্জামাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইন ও বিচার বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগে পাঠানোসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পালন করবে। একইভাবে সার্ভিসের প্রশাসনিক পদও সৃজন করা হবে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, বিচারিক পদ সৃজন কমিটির পরামর্শ গ্রহণক্রমে, বিচারিক পদসমূহের জন্য আদর্শ সহায়ক জনবল কাঠামো নির্ধারণ করে আদেশ জারি করতে পারবে।
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মাসদার হোসেনের মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আইন ও বিচার বিভাগে পদায়ন নীতিমালা জারি করা হয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক যে জটিলতা ছিল, তা নতুন বিধিমালার মাধ্যমে দূর হবে বলে আশা করি।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদ ২ হাজার ১৩৩টি
জুডিশিয়াল সার্ভিসের মোট পদ চূড়ান্ত করা হয়েছে দুই হাজার ১৩৩টি। এরমধ্যে বিচারিক কার্যক্রমের জন্য পদ সংখ্যা হলো দুই হাজার। প্রশাসনিক কাজের জন্য পদ ১৩৩টি। ছুটি, প্রেষণ এবং প্রশিক্ষণের জন্য সংরক্ষিত পদ আছে ১০ ভাগ। সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় গঠন করা হলে প্রশাসনিক পদের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানা গেছে।
