ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

কুমিল্লা

হত্যাসহ জুলাই মামলা ৪২, অভিযোগপত্র মাত্র দুটিতে

কিছু মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলছে না: পুলিশ

হত্যাসহ জুলাই মামলা ৪২, অভিযোগপত্র মাত্র দুটিতে
×

প্রতীকী ছবি

 কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৮ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় মোট ৪২টি মামলা হয়। এর মধ্যে দুটি মামলায় পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে। অন্য মামলাগুলোর তদন্ত শেষ না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে ক্ষোভ বাড়ছে। অবশ্য পুলিশ বলছে, আগামী আগস্টের মধ্যে অধিকাংশ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। 
পুলিশ জানিয়েছে, ৪২টি মামলার মধ্যে ১২টিই হত্যার ঘটনায় দায়ের করা। অন্য ৩০টি হত্যাচেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অস্ত্র বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা হয়। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি প্রায় ৩ হাজার ৫৬৫। অজ্ঞাতনামা আসামি সাড়ে ৬ হাজারের মতো। হত্যার ঘটনায় দুটি মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়নি। 

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘প্রতিটি মামলা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। অধিক আসামি হওয়ায় তাদের বিষয়ে তথ্য ও পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় তদন্তে জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে। তাই তদন্ত প্রক্রিয়ায় কিছুটা বাড়তি সময় লাগছে।’

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুটি হত্যাসহ সর্বাধিক ১৮টি মামলা হয়েছে কোতোয়ালি মডেল থানায়। এসব মামলায় সদর আসনের সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার মধ্যে গুলিতে নিহত আইনজীবী আবুল কালাম হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে বাহাউদ্দিনসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ময়নামতি এলাকার হোটেলের কর্মচারী হবিগঞ্জের মামুন আহমেদ রাফসান (১৮) হত্যার ঘটনায় একই থানায় মামলা করা হয়। তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি। 

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার সমকালকে বলেন, প্রতিটি মামলায় অনেক আসামি। তাই ঘটনার সাক্ষ্যপ্রমাণসহ অন্যান্য তথ্য বের করতে হচ্ছে। এ কারণে অভিযোগপত্র দিতে বিলম্ব হচ্ছে। পরিবার আগ্রহী না হওয়ায় রাফসানের মরদেহ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়নি। 
মামলার বাদী নিহত রাফসানের বড় ভাই রানু মিয়া বলেন, ‘মামলা করার সময় কুমিল্লা গিয়েছিলাম। পরে আর যাওয়া হয়নি। ঘটনার ১০ মাস পর গত বছরের ২৮ মে মামলা করি। এত দেরি হওয়ায় ভাইয়ের ময়নাতদন্ত করতে পরিবার রাজি হয়নি।’ 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের অন্য মামলাগুলোর মধ্যে দাউদকান্দি মডেল থানায় ৩টি হত্যাসহ মোট ৪টি, দেবিদ্বার থানায় ৩টি হত্যাসহ ৪টি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ১টি হত্যাসহ ৬টি, বরুড়া, নাঙ্গলকোট ও চৌদ্দগ্রাম মডেল থানায় একটি করে হত্যা মামলা হয়। এর মধ্যে বরুড়া থানায় একটি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র হয়েছে। এ ছাড়া চান্দিনা, মনোহরগঞ্জ, বুড়িচং ও বাঙ্গরা বাজার থানায় রয়েছে হত্যাচেষ্টার আরও ৭টি মামলা। এ ছাড়া জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সদর দক্ষিণ উপজেলার আলোচিত মাছুম হত্যাসহ ৪টি মামলার তদন্ত করছে। 

দেবিদ্বার উপজেলা সদরে গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবদুর রাজ্জাক রুবেল (৩৫)। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল কাসেম আদালতে মামলা করেন। একই ঘটনায় থানায় আরেকটি মামলা করেন নিহতের মা হোসনে আরা বেগম। এসব মামলায় স্থানীয় সাবেক এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, আবুল কালামসহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ১৪০ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়।
নিহত রুবেলের স্ত্রী হ্যাপী আক্তার বলেন, প্রথম দিকে বিএনপি নেতারা খোঁজখবর নিলেও এ বছর কোরবানির ঈদে বিএনপির কেউ খবর নেননি। রুবেলের মৃত্যুর পর (৯ সেপ্টেম্বর) জন্ম নেওয়া তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ আল রাইয়ানের বয়স এখন প্রায় দুই বছর। মামলার তদন্ত কী পর্যায়ে আছে তা পুলিশ বলছে না। স্বামী হত্যায় জড়িতদের বিচার দাবি করেন তিনি।

আরেক ঘটনায় দেবিদ্বার উপজেলা সদরে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাব্বির (১৮)। এ ঘটনায় তাঁর মামা নাজমুল হাসান বাদী হয়ে দেবিদ্বারের সাবেক দুই এমপিসহ ৯৯ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। তবে মামলার তদন্তে জটিলতায় পড়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় পুলিশ আদালতে আবেদন করেও ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ তুলতে পারেনি। 

দেবিদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘আমরা আদালতে একাধিকার আবেদন করেও পরিবার রাজি না হওয়ায় মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে পারিনি। মামলার তদন্ত চলছে।’ 
আন্দোলন চলাকালে সদর দক্ষিণে মাছুম মিয়ার হত্যার ঘটনায় জেলায় প্রথম হত্যা মামলা হয়। চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তাঁর বাবা শাহীন মিয়া। তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর ভয়ে মামলা করিনি। তখন বিএনপি নেতারা মামলা করেন, আমি থানায়ও যাইনি। আসামি কারা তা আমি পরে জেনেছি এবং পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছি। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে সকলের দ্রুত বিচার চাই।’

জুলাই আন্দোলনে দাউদকান্দিতে নিহত হন স্কুলছাত্র রিফাত হোসেন (১৭), দিন মজুর বাবু মিয়া (২৩) ও অটোরিকশা চালক সুলতান আহমেদ। এই তিন হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে দাউদকান্দি থানা ওসি সাজেদুর রহমান সমকালকে বলেন, এসব মামলার তদন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণ, ভিডিও ফুটেজসহ বেশ কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে। 
জুলাই মামলার তদন্তের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঢালাও আসামি থাকায় মামলার বাদী সব আসামিকে চেনেন না। একই সময়ে একই আসামিকে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাস্থলে উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। তাই যথাযথ সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। 
কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘স্পর্শকাতর এই মামলাগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পুলিশ নিবিড়ভাবে কাজ করছে। আশা করছি, আগামী আগস্টের মধ্যেই অধিকাংশ মামলায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে।’ 

আরও পড়ুন

×