বনের বুক চিরে সড়ক, ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য
সংরক্ষিত বনে ৩০টি সড়ক নির্মাণ চেয়ে এমপির ডিও লেটার
কক্সবাজারের মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের মধ্য দিয়ে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করছে এলজিইডি। সম্প্রতি তোলা সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া মধুশিয়া বন। বনে উঁচু গর্জন গাছ, নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে খুঁটাখালী খাল। বনের ভেতরে রাতে হেঁটে বেড়ায় হাতির পাল। এখানেই আছে মহাবিপন্ন এশীয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ (করিডোর)।
অন্যদিকে, মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সরু পথ চলে গেছে পাহাড়ি বনের বুক চিরে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বনেই রয়েছে মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, বানর, মুখপোড়া হনুমান, বিপন্নপ্রায় পাহাড়ি কচ্ছপ ও অজগরের আবাসস্থল।
এ দুই সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের ভেতর দিয়েই দুটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জন বনের ভেতরে সড়কটির দৈর্ঘ্য হবে পাঁচ কিলোমিটার, আর মহেশখালীর বনের সড়কটি হবে প্রায় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। দুটি প্রকল্পেই অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনের ভেতরে সড়ক নির্মাণ ঘিরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও বন বিভাগের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সড়ক নির্মাণে সহযোগিতার জন্য বন বিভাগকে ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। তাতেও দমে যায়নি বন বিভাগ। দিয়েছে পাল্টা জবাব। বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনে পাকা সড়ক নির্মাণ আইনবিরোধী এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের কাজের সুযোগ নেই। বন বিভাগের তীব্র আপত্তি, পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ এবং আইনি জটিলতার মধ্যেও প্রকল্প দুটির কাজ এগিয়ে চলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সড়কের কারণে বনের ভেতরে মানুষের অবাধ প্রবেশ, দখল, অবৈধ বসতি, বন্যপ্রাণী শিকার এবং বনভূমি ধ্বংসের নতুন পথও তৈরি করবে। জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রায়হান কাউছার বলেন, বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের জন্য অনাপত্তি চেয়ে আবেদন এসেছে। এখনও অনুমতি দেওয়া হয়নি।
সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক
কক্সবাজার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চকরিয়ার খুঁটাখালী থেকে রামুর ঈদগড় পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ১৯ কোটি টাকার বেশি। কাজ শুরু হয় গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি। আগামী বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের আওতায় খুঁটাখালী বাজার থেকে মধুশিয়া এবং ঈদগড় থেকে কালাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে মধুশিয়া গর্জন বনের ভেতর দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার অংশ।
বন বিভাগের অভিযোগ, প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ করার পর তাদের কাছে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চাওয়া হয়েছে। অথচ বনভূমির ভেতরে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বন বিভাগের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেন বলেন, মধুশিয়া গর্জন বন হাতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ। এখানে রাস্তা নির্মাণ করা হলে হাতির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে মানুষ ও হাতিতে সংঘাত বাড়বে এবং প্রাচীন এই গর্জন বন ঝুঁকিতে পড়বে।
চকরিয়া উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল আলম বলেন, প্রকল্পের দুটি প্যাকেজে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে উভয় প্রান্তে কাজ চলছে। বন বিভাগ যে অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছে, সেখানে এখনও নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। তিনি বলেন, যেসব অংশে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, সেখানে বন বিভাগের জমি বা বনাঞ্চল নেই। রয়েছে বাজার, বসতি ও কৃষিজমি। তাই ওই অংশে বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হয়নি। এখন যে অংশ বন রয়েছে, সেই অংশের জন্য অনাপত্তিপত্র চাওয়া হয়েছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হাতির করিডোর চিহ্নিত করতে একটি সমীক্ষা চালায়। ‘অ্যাটলাস: এলিফ্যান্ট রুটস অ্যান্ড করিডোরস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই সমীক্ষায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১২টি হাতির করিডোর চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে আটটি করিডোর রয়েছে কক্সবাজার অঞ্চলে। সেগুলোর অন্যতম হলো খুঁটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া করিডোর, যার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মধুশিয়া গর্জন বন।
এমপির ডিও লেটার
কক্সবাজারের মহেশখালীতে সংরক্ষিত বনের বুক চিরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলে গেছে পথটি। মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে শুরু হয়ে রাস্তাটি গেছে কালারমারছড়ায়। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বনের এই রাস্তাটি পাকা করতে চায় এলজিইডি। জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে জেএম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত সড়ক পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু অংশে ঢালাইয়ের পাশাপাশি কালভার্ট নির্মাণের কাজও চলছে।
তবে বন বিভাগ বলেছে, যে বনভূমির ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি ১৯৫৭ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সরকারের আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর পাকা রাস্তা করার সুযোগ নেই। এতে বন এবং বন্যপ্রাণী উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে। তাদের দাবি, এটি নানা প্রজাতির গাছপালার পাশাপাশি হরিণ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এখানে বন বিভাগের বনায়ন কর্মসূচিও চলমান।
এদিকে মহেশখালীর সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণে অনাপত্তিপত্র চেয়ে বন অধিদপ্তরে ডিও লেটার দিয়েছেন কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ। তিনি সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে ৩০টি সড়ক নির্মাণ করতে চান। গত ২০ মে দেওয়া ওই চিঠিতে এসব সড়ক বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান। এ ব্যাপারে আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বলেন, মানুষের যোগাযোগ ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য রাস্তা প্রয়োজন। সড়ক না করলে মানুষ চলাচল করবে কীভাবে? দরপত্র হয়ে গেছে, কিন্তু বন বিভাগের কারণে কাজ আটকে আছে।
তবে বন বিভাগ তাঁর এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দিয়েছে, সংরক্ষিত বনের মধ্যে পাকা রাস্তা নির্মাণ আইনবিরোধী এবং সরকারপ্রধানের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের কাজের সুযোগ নেই।
মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, জনগণের প্রয়োজনেই সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের আপত্তির কারণে কাজ এগোতে পারছে না।
কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাঁটার পথ থাকলেও সংরক্ষিত বনের ভেতর পাকা রাস্তা করার সুযোগ নেই। পাকা রাস্তা হলে পাচারকারীরা বন উজাড় করে ফেলবে; দখল হয়ে যাবে বনভূমি। তিনি দাবি করেন, এলজিইডি রাস্তার কাজ বন্ধ না করলে তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
প্রকৃতি সংরক্ষণকর্মী রাসেল মাহফুজ বলেন, মধুশিয়া গর্জন বনটি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। আইন অনুযায়ী, বনভূমিকে বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যায় না। দেশের সংবিধানেও বলা আছে, বর্তমান ও পরবর্তী সময়ে প্রজন্মের জন্য বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করবে সরকার। দেশের সংবিধান ও আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এ ধরনের প্রকল্প থেকে সরে আসা উচিত।
আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন ২০২৬-এর ৭ ধারায় বলা হয়েছে, বনবহির্ভূত কাজে কোনো প্রাকৃতিক বন ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কোনো বিকল্প না থাকলে মন্ত্রিসভার সম্মতি ও সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে তা করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি বিবেচনা করা বাধ্যতামূলক। জাতীয় বননীতি ২০২৫-এ বনভূমিকে বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ২০০১ সালের জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিতেও বনভূমি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ
গত ১ জুলাই বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে চিঠি দিয়ে খুঁটাখালী-ঈদগড় সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানায়। তাদের মতে, মধুশিয়া গর্জন বন শুধু হাতির করিডোর নয়; এটি বনশূকর, শিয়াল, বানর, বনমোরগ, নানা প্রজাতির পাখি, সরীসৃপেরও গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পরিবেশবাদীর শঙ্কা, নতুন সড়ক চালু হলে বনাঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত বাড়বে। ফলে বন উজাড়, অবৈধ দখল, বন্যপ্রাণী শিকার এবং কাঠ পাচারের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
বেলার প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রচলিত আইনে ওই দুটি বনে সড়ক করার সুযোগ নেই। সড়ক প্রকল্প দুটির না আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি, না আছে বন বিভাগের অনুমতি। বন বিভাগ সুস্পষ্টভাবে আপত্তি তোলার পরও অন্য মন্ত্রণালয়গুলো বন বিভাগের কর্তৃত্ব মানছে না। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটাচ্ছে।