হাইকোর্টের রায়
অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ফিরছে সুপ্রিম কোর্টের হাতে
তিন মাসের মধ্যে ‘স্বতন্ত্র সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ
.
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৬ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:০০
অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার রায় এসেছে হাইকোর্টে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন বাতিল করে আগের (১৯৭২ সালের) অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে এ-সংক্রান্ত রুল যথাযথ ঘোষণা করেন।
রায়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিচার বিভাগের জন্য ‘স্বতন্ত্র সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ফলে বিচার বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। আগে এসব দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁকে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছিল।
আদালতে এ-সংক্রান্ত রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানি করেন আইনজীবী আহসানুল করিম ও মাহিউদ্দিন।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে গত বছরের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী রিট আবেদনটি করেছিলেন। তারা হলেন– সাদ্দাম হোসেন, জহিরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল্লাহ সাদিক, মিজানুল হক, আমিনুল ইসলাম শাকিল ও যায়েদ বিন আমজাদ।
আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছর ২৭ অক্টোবর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং এ-সংক্রান্ত ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না– জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় কেন প্রতিষ্ঠা করা হবে না– তাও জানতে চান আদালত।
আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
গত ২৫ মার্চ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব আপিল বিভাগের বিচারপতি পদে নিয়োগ পান। পরে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি শুনানি এবং নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান। এ বেঞ্চ উভয় পক্ষে কয়েক দিন রুল শুনানির পর গতকাল রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন।
কী আছে রায়ের পর্যবেক্ষণে
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি কোনো আইন সংসদ প্রণয়ন করতে পারে না। যদি এমন আইন করা হয়, তবে তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, সংবিধান সাধারণ কোনো আইন নয়। সংবিধানের কোনো বিধানকে যখন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়, তখন পূর্ববর্তী বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত বা পুনর্বহাল হয়ে যায়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলা, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সাংবিধানিক মামলার রায়ে এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ হয়নি।
রিটকারীদের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, রায়ের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের করায়ত্ত ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে অধস্তন বিচার বিভাগ মুক্তি পেল। অধস্তন আদালতের কর্মকর্তারা তাদের আত্মমর্যাদা ও সম্মান ফিরে পেলেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, রায়ে ১৯৭২ সালের ১১৬ অনুচ্ছেদের পরে যে সংশোধন করা হয়েছে, তা বাতিল করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ছিল। পরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়।
আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে দুবার পরিবর্তন এসেছে। পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে ১১৬ অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চতুর্থ সংশোধনীতে ফিরে গেছে। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফেরার সুযোগ নেই।
তিন মাসের মধ্যে স্বতন্ত্র সচিবালয়
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় নিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্র সচিবালয় রয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয়ের কথা সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ে উল্লেখ থাকলেও এখন পর্যন্ত হয়নি। আমরা মনে করি, স্বতন্ত্র সচিবালয় না করা সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি। তা ছাড়া এটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা কোনো আপত্তি করেননি। বিচার বিভাগ ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এ দুটি কমিশনের সুপারিশে সমর্থন জানিয়েছে ৩১টি রাজনৈতিক দল। সুতরাং হাইকোর্ট মনে করছেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখতে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার এখনই উপযুক্ত সময়। ফলে বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হলো সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাবনা অনুসারে রায়ের অনুলিপি পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে।
এ ব্যাপারে শিশির মনির বলেন, আলাদা বিচার বিভাগের সচিবালয় গঠনের নির্দেশ অতি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়। এটি যেন সরাসরি আপিল করা হয়, সে বিষয়ে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রায়ের মাধ্যমে দেশে বিচার ব্যবস্থার যে অনিশ্চয়তা ও প্রভাব আছে– যখন যে সরকার আসে, তখন তারা বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করতে চায়। দিনে কোর্ট বসায়, রাতে কোর্ট বসায়, যখন যাকে খুশি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে; কে পছন্দের, কে অপছন্দের– এসব দুষ্টচক্রের অবসান ঘটবে।
রায়ে যা আছে
১১৬ অনুচ্ছেদে এ পর্যন্ত যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তা অবৈধ এবং অসাংবিধানিক উল্লেখ করে বাতিল করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করতে বলেছেন।
১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেছেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারা অনুসারে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনও সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের নজির অনুসারে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, সেভাবেই পুনরুজ্জীবিত ও সংবিধানে পুনর্বহাল হবে। রায়ের দিন থেকে এটি কার্যকর হবে।
রায়ে বলা হয়েছে, শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছিল– বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বিনষ্ট হবে। হাইকোর্ট মনে করেন, এ যুক্তি সঠিক নয়। কারণ সংবিধানে বলা আছে, বিচার বিভাগ প্রভাবমুক্ত থাকবে। তা ছাড়া রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের (আইন, শাসন বা নির্বাহী ও বিচার বিভাগ) মধ্যে ক্ষমতার যে পৃথক্করণ নীতি; বিদ্যমান ১১৬ অনুচ্ছেদ সেটি খর্ব করেছে। রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের একটি আরেকটির ওপর প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না। আদালত মনে করেন, বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক এবং এটি বাতিল ঘোষণা করা হলো। একই সঙ্গে আদি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হলে তা হবে ক্ষমতা পৃথক্করণ নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন।
হাইকোর্ট আরও বলেন, ২০১৭ সালে তৎকালীন সরকার অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধিমালা করে। রিটকারীদের দাবি– তৎকালীন সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করে এ বিধিমালা করেছিল। অথচ এ বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়ন না করায় ২০১৭ সালের শৃঙ্খলাবিধি অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করা হলো।
- বিষয় :
- হাইকোর্টের রায়
- নির্দেশনা
