দেশে ১৭ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা, বৈষম্য বাড়ছে
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৫ | আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, দেশে ১৭ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। এই ব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে চরম বৈষম্য তৈরি করছে। পৃথিবীতে আর কোথাও এমন জগাখিচুড়ি শিক্ষা ব্যবস্থা নেই। কওমি, ইংরেজি মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন, কিন্ডারগার্টেন, আলিয়া, কারিগরিসহ বিভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় করার কেউ নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কার্যালয়ে ‘শিক্ষায় নিষ্ক্রিয়তার মূল্য: সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি’ শীর্ষক আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। এতে সরকারের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে গত বছর নায়েম-ইউনেস্কো যৌথভাবে প্রকাশিত ‘শিক্ষায় নিষ্ক্রিয়তার মূল্য’ শীর্ষক প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করা হয়। ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়।
ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪৯ শতাংশ ছেলে এবং ৩৩ শতাংশ মেয়ে এখনও শিক্ষার বাইরে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে বা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে ২১ শতাংশ গণিতে এবং বিজ্ঞানে মৌলিক দক্ষতার স্তরে পৌঁছায় না। শিশুদের এই না শেখার ফলে ২০৩০ সালে ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমাজ-অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা জিডিপির ১৭ শতাংশের সমান। মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থতা শুধু একজন শিশুর ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চিত করে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজ ও অর্থনীতির ওপর। শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও দক্ষতা অর্জন না করার ফলে দেশের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়, যার প্রভাব জিডিপিতেও পড়ে। এই ক্ষতি কেবল আর্থিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অল্প বয়সে গর্ভধারণ, সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির মতো সামাজিক ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। বিশেষত মেয়ে শিশুরা এই ঝুঁকির মধ্যে বেশি পড়ে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। নায়েমের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. জুলফিকার হায়দার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সূচনা বক্তব্য দেন ইউনেস্কোর ঢাকা অফিসের হেড অব এডুকেশন নরিহিদি ফুকুওয়াতা।
আলোচনায় শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, শুধু সরকারের পক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ড. মনজুর আহমেদ বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েও দেখা যায় একটি শিশু রিডিং পড়তে পারে না। এ ক্ষেত্রে দেশে প্রতি জেলায় একটি শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। পরীক্ষামূলকভাবে তা চালু করা যেতে পারে। সব শিশুর জন্য মানসম্মত, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সরকারি খরচে দিতে হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) নূরজাহান খাতুন বলেন, জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ আমরা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করছি। এ কারণেই শিক্ষার সংকট কাটছে না। শুধু মাদকের কারণে দেশের কিছু জেলার শিক্ষার হার কমে গেছে।
মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) খান মাইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, প্রাথমিকে ঘাটতি নিয়ে শিশু মাধ্যমিকে আসছে। মাধ্যমিক শিক্ষার পরিকল্পনা সবই আছে, তবে অগোছালো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার তথ্য একেকজনের কাছে একেক রকম। শিক্ষকদের কাছে যে তথ্য আছে, তা হয়তো শিক্ষার নীতিনির্ধারকদের কাছে নেই।
এনটিআরসিএর সদস্য মাহবুব হাসান শাহীন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ঘটনা ছাত্রীদের উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনও শক্ত হাতে প্রয়োগ করতে হবে। আইআইডির ইয়ুথ ফর এডুকেশনের সিনিয়র সহকারী পরিচালক বিধান ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসীদের পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যবই দেওয়া হলেও এ বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। ত্রিপুরাদের ভাষায় দুটি অংশ থাকলেও বই লেখা হয়েছে শুধু বান্দরবানের ত্রিপুরাদের ভাষায়, যা খাগড়াছড়ির ত্রিপুরারা বোঝেন না।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষার মান ও প্রবেশাধিকার উভয় দিক থেকেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ১৩.৯৫ শতাংশ ও মাধ্যমিকে ৩২.৮৫ শতাংশ। ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট ২০২২ অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ বাংলা সঠিকভাবে পড়তে পারে না। গণিতে প্রত্যাশিত মান অর্জন করে মাত্র ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী।
- বিষয় :
- পিডিবি
