ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিভাজন প্রকট

৬ দিন ধরে অচলাবস্থা, জলবায়ু সম্মেলন ভেঙে পড়ার মুখে

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের শক্তির বৈষম্য

৬ দিন ধরে অচলাবস্থা, জলবায়ু সম্মেলন ভেঙে পড়ার মুখে
×

ছবি: সংগৃহীত

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৮ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাজনের মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্রাজিলের বেলেম শহরে এখন আর্দ্র গরমে হাঁসফাঁস করছেন অর্ধলাখ প্রতিনিধি, কূটনীতিক, বিজ্ঞানী, জলবায়ুকর্মী ও লবিস্ট। জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। এবারের সম্মেলন জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকানোর লড়াইয়ে বড় মোড় ঘোরাবে– এমনটাই আশা ছিল। অথচ জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০ শুরুর ছয় দিনের মাথায় দেখা যাচ্ছে গভীর অচলাবস্থা। সম্মেলনজুড়ে বাড়ছে হতাশার ছবি। জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায্য রূপান্তর আর প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন– এমন তিনটি জরুরি ইস্যু কার্যত স্থবির। কৌশলগত কিছু বিষয়ে সামান্য এগোনো গেছে ঠিকই, কিন্তু বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এখনও অপরিবর্তিত পড়ে আছে।

ধনী দেশগুলোর বহু সদস্য, প্রতিনিধি দল আলোচনার জায়গাগুলো দখলে রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জাপানের মতো দেশগুলো সারা বছর জলবায়ু কূটনীতি নিয়ে আলাদা দল চালায়। তারা শত শত প্রতিনিধিসহ কপে আসে। আলোচনাকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নিতে পারে। এর ঠিক উল্টো চিত্র উন্নয়নশীল দেশগুলোর। শক্তির এ অসমতা যে কোনো ঐকমত্যকে আগেই দুর্বল করে দেয়। তার ওপর যোগ হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্টদের চাপ। হোটেল থেকে সাইড ইভেন্ট– সবখানেই তাদের সরব উপস্থিতি। সমালোচকদের ভাষায়, কপ এখন আংশিকভাবে ব্যবসায়িক মেলায় পরিণত হয়েছে। অনেক সিদ্ধান্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা জলবায়ু সম্মেলনে আসেন। ফলে আলোচনার গতি আরও ধীর হয়ে যায়।

এদিকে এবারের সম্মেলনে প্যারিস চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল ৯ দশমিক ১– জলবায়ু অর্থায়নে উন্নত দেশগুলোর বাধ্যবাধকতা নিয়ে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি, স্পষ্ট জবাবদিহি, নতুন আলোচ্যসূচি ও স্বচ্ছতা। কানাডা প্রশ্ন তুলছে, এগুলো আদৌ দরকার কিনা।

নিঃসরণ কমানো ও ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার লক্ষ্য নিয়েও তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও দুর্বল দেশগুলো লক্ষ্যটিকে চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে রাখতে চায়। আরব গ্রুপ বলছে, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি তো আমরা ইতোমধ্যেই অতিক্রম করেছি– এটা ধরে রাখার অর্থ কী? উন্নত দেশগুলো চাচ্ছে ন্যায্য রূপান্তর আর নিঃসরণ কমানোকে এক ফ্রেমে বাঁধতে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় অংশ তা মানতে নারাজ।

ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। উন্নয়নশীল দেশগুলো দ্রুত সরাসরি অর্থ চাচ্ছে। ইইউ-অস্ট্রেলিয়া বলছে, অতিরিক্ত নির্দেশনা দিলে কাজ জটিল হয়ে যাবে। প্যারিস চুক্তির ২ দশমিক ১(সি) বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও পুরোনো মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ বলছে, আগে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার দরকার নেই, কেউ চাচ্ছে স্পষ্ট আর্থিক নীতি।

আরেক দিকে জেন্ডার নীতি নিয়ে অবিশ্বাস্য অচলাবস্থা। কয়েকটি দেশ বলছে, জাতিসংঘের নথিতে জেন্ডার মানে শুধু ‘জৈবিক লিঙ্গ’ হতে হবে। এতে গত এক দশকের ভাষা ও অগ্রগতি সরাসরি পেছনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এ বিতর্ক এখন প্রয়োজনীয় আলোচনা থামিয়ে দিয়েছে। ইরান বলছে, ‘সমান অংশগ্রহণ’ শব্দটাই তারা মানে না। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো জেন্ডারের প্রথাগত সামাজিক সংজ্ঞা তুলে ধরছে।

বেলেমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বিশৃঙ্খলা। রাতে ৯টা পর্যন্ত বৈঠক, দূরদূরান্তে থাকা প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, ক্লান্তির চাপে ভুল বোঝাবুঝি– সব মিলিয়ে গতিবেগ আরও কমে এসেছে। এর বাইরেও আছে রাস্তায় উত্তেজনা। আদিবাসীদের একের পর এক বিক্ষোভ চলছে। গতকাল কপের মূল ফটক কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দিয়ে তারা বিক্ষোভ করেন। প্রথম দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করায় এখন ক্ষোভ আরও বড় হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সম্মেলনে আদিবাসী অধিকার নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, উল্টো তাদের উপস্থিতিই দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পিপলস সামিটের নৌ বিক্ষোভে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়ে বলেছে, বৈশ্বিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার দায় উন্নয়নশীল ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো যাবে না।

সব মিলিয়ে একটা প্রশ্ন স্পষ্ট– কপ৩০ কি ভেঙে পড়ছে? উত্তর সরল নয়। সম্মেলন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। কিন্তু স্থবিরতা এত গভীর, অনেকেই বলছেন, বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তন চাচ্ছে, আর কপ সেই গতি ধরতে পারছে না।

কপ বা কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ হলো, জাতিসংঘের জলবায়ু ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত নির্ধারণী সভা। লক্ষ্য– বিপজ্জনক জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকাতে বৈশ্বিক ঐকমত্য সৃষ্টি। প্রতিবছর ভিন্ন দেশে আয়োজন হয়। নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সর্বসম্মতিতে, যাতে অন্তত কাগজে সমান গুরুত্ব পায়। কাগজে সমান হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। দেশগুলোর সক্ষমতার বৈষম্য এত বড়,  কিছু দেশের কণ্ঠ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি প্রবল। সম্মেলন এত বড় ও জটিল হয়ে উঠেছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গরিব দেশগুলো বাস্তবিকভাবে এর আয়োজক হতে পারে না। এত জটিল প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে গেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় বাধার মুখে পড়তে হয়। 

ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থের প্রধান নির্বাহী আসাদ রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলোতে সারা বছর জলবায়ু আলোচনায় কাজ করে এমন দল থাকে। তারা সারা পৃথিবীতে ঘুরে জলবায়ু কূটনীতি করে। বিশাল বহর নিয়ে জলবায়ু সম্মেলনে আসে। জটিল কৌশলে আলোচনাকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে যায়। এর বিপরীতে ধরুন লেসোথো। সেখান থেকে এক বা দুই জন প্রতিনিধি আসেন। সেই প্রতিনিধি পরিবেশ, অর্থনীতিসহ সবকিছুর দায়িত্বে একাই থাকেন। ফলে শক্তির ভারসাম্য কল্পনাতীতভাবে অসম। 

শুধু উন্নত দেশই নয়, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কপে বিপুল উপস্থিতি দেখাচ্ছে। তাদের সংখ্যা দেখে মনে হয়, কপের একাংশ এখন ব্যবসায়িক মেলায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, এত বেশি প্রতিনিধি নিয়ে তারা শারীরিকভাবেই জায়গা দখল করে নেয়। হোটেলগুলো ব্লক বুক করে ফেলে। নানা সাইড ইভেন্ট দিয়ে আলোচকদের সময় খরচ করায়। এসবের ফলে যে মানুষগুলোর জীবন ঝুঁকিতে, তাদেরই কপ থেকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। তাদের উপস্থিতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা দুর্বল করে, গতি কমায়, আস্থা নষ্ট করে। যখন স্বার্থান্বেষী পক্ষ ঘর ভরে ফেলে, আলোচনার ফোকাস জরুরি রূপান্তর থেকে সরে গিয়ে ধীরগতির বিলম্বে আটকে যায়।

গত শুক্রবার জলবায়ু সম্মেলনে ঝুঁকিপূর্ণ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থিক চাপ নিয়ে ‘ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’ শীর্ষক একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ্য– জলবায়ু দুর্যোগ, অভিযোজন ব্যয় ও জাতীয় ঋণের সম্পর্ক তুলে ধরতে বৈশ্বিক সূচক প্রণয়ন। সভায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু ক্ষতির দায় যাদের কম, তাদেরই এখন সবচেয়ে বেশি ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে। নতুন সূচক সেই বাস্তবতাকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরবে।

জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়া স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, কপ৩০-এর ষষ্ঠ দিনেও বৈশ্বিক জলবায়ু নীতি ও নেতৃত্ব স্পষ্টতই জটিল ও অনিশ্চিত। জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্টদের প্রভাব, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নীতি প্রত্যাহার ও লিঙ্গভিত্তিক বিতর্ক বাস্তবায়নকে ধীর করছে। বার্তাটি পরিষ্কার– ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমার মধ্যে থাকতে হলে এখনই শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি দরকার। কপ৩০ মনে করিয়ে দিচ্ছে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে; এখনই নেতৃত্বকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সময়।

আরও পড়ুন

×