বাস্তব ফল ছাড়াই জলবায়ু সম্মেলন শেষ হওয়ার ঝুঁকি
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:০২ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্রাজিলের বেলেমে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ১০ নভেম্বর শুরু হওয়া এ আয়োজন আগামী শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা। তবে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো এখনও চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে একমত হতে পারেনি। কোন কোন বিষয়ে একমত হওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র মতবিরোধ।
জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জেন্ডার সমতা ও ন্যায্য রূপান্তর– প্রায় সব আলোচ্য ইস্যুতেই অগ্রগতি সীমিত। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো বলছে, কার্যকর সহায়তা ছাড়া বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কাগুজে স্বপ্নে পরিণত হবে এবং জলবায়ু বিপর্যয় আরও তীব্র হবে।
প্রথম সপ্তাহজুড়ে আর্থিক কাঠামো, বিজ্ঞানভিত্তিক লক্ষ্য, প্রযুক্তি প্রক্রিয়া এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধের গতি নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আলোচনায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা বলছেন, বহু ইস্যুতে অচলাবস্থা দূর না হলে সম্মেলন বাস্তব ফল ছাড়াই শেষ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯.১-কে স্বতন্ত্র এজেন্ডা আইটেম হিসেবে গ্রহণ করা হবে কিনা–এ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বেলেমে সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের উপপ্রধান নাভিদ শফিউল্লাহ বলেন, অচলাবস্থার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ছে– যারা ইতোমধ্যে ঋণের চাপ ও ঘনঘন দুর্যোগের মুখোমুখি। তিনি বলেন, অনুচ্ছেদ ৯.১-কে আলাদা এজেন্ডা আইটেম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে এখনও ঐকমত্য হয়নি। এটি উন্নত দেশগুলোর আর্থিক দায় কমানোর বড় ধরনের প্রবণতারই অংশ।
প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯.১-এ উন্নত দেশগুলোর ওপর প্রশমন ও অভিযোজন– দুই ক্ষেত্রেই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে– নতুন জলবায়ু অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, ২০৩০ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ বাড়িয়ে ১২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত এবং অনুদানভিত্তিক সরকারি অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও জাতিসংঘ উইং-প্রধান একেএম সোহেল বলেন, বাংলাদেশ আশাবাদী। আমরা এ বিষয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই।
মঙ্গলবার বেলেমে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে দ্রুত প্রভাব ফেলছে। সংকট কাটাতে জলবায়ু-সংক্রান্ত নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি অবিলম্বে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নারীদের সুরক্ষায় অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড (বিএফটিডব্লিউ) এবং এইচইকেএস/ইপিইআর যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গবেষণা উপস্থাপন করেন সিপিআরডির সহকারী ব্যবস্থাপক (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি) শেখ নুর আতিয়া রাব্বি। তিনি জানান, বাংলাদেশের উপকূলবর্তী ৪০০ প্রজননক্ষম নারীর ওপর গবেষণায় মাসিকের অনিয়ম, গর্ভধারণের জটিলতা, সংক্রমণ এবং খাদ্য-পানি অনিরাপত্তার উচ্চমাত্রা শনাক্ত হয়েছে– যা দীর্ঘদিনের জলবায়ু চাপের কারণে আরও বেড়েছে।
মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রধান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন কোনো সাধারণ আলোচ্যসূচি নয়। এটি টিকে থাকা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। তিনি উন্নত দেশগুলোর প্রতি অনুদানভিত্তিক সহায়তার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। বলেন, ‘আমরা ঋণ চাই না, আমাদের দরকার অনুদান।’
ওয়ারশ ইন্টারন্যাশনাল মেকানিজমের নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হাফিজুল ইসলাম খান বলেন, আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। এখনই সিদ্ধান্তের সময়। অচলাবস্থা কাটাতে না পারলে কপ৩০ প্রত্যাশিত ফল দেবে না।
বেলেমে অবস্থানরত বাংলাদেশের জলবায়ু কর্মী সোহানুর রহমান বলেন, বেলেমে গতকাল দুপুরে যে দমকা হাওয়া আর বৃষ্টি মিডিয়া সেন্টার পর্যন্ত ঢুকে পড়ল, সেটা যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল– সম্মেলনে বসে যে পৃথিবী রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, সেই পৃথিবীই এখন অস্থির। অথচ সময় ফুরিয়ে গেলও কপে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। অর্থায়ন, বাণিজ্য, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে ভরসা দেওয়ার মতো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আসেনি। তেলের দেশগুলোর অনমনীয়তা আর ধনী দেশগুলোর নিরাপদ দূরত্ব মিলিয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি লক্ষ্যের জানালাটা আরও সরু হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের দাবি খুব সোজা– দায়িত্ব ভাগ করা হোক সক্ষমতা অনুযায়ী, আর রূপান্তর হোক মানুষকেন্দ্রিক। কপ৩০-এর এই সপ্তাহ নির্ধারণ করে দেবে বেলেম কি পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠবে? নাকি আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া হবে।
- বিষয় :
- জলবায়ু সম্মেলন
- জলবায়ু
