সংকট মোকাবিলার গতি এখনও বেশ ধীর
জরুরি অর্থায়ন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত চায় বাংলাদেশ
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৭ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে ধরিত্রী সম্মেলনের মাধ্যমে বিশাল যজ্ঞের শুরু। গঠন করা হয় জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক কনভেনশন। ১৯৯৪ সাল থেকে ফি বছরই জলবায়ু সম্মেলন হচ্ছে। দিন দিন এর কর্মপরিধিই বেড়েছে। সম্প্রতি সম্ভবত দীর্ঘ সময় ধরে চলা আন্তঃরাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন। এরপরও দেশগুলো কোনো কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না। এবার সেই ব্রাজিলের বেলেমে চলমান জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ একটি মৌলিক প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে– বৈশ্বিক এ আয়োজন আসলে কতটা কার্যকর, কেনই বা প্রতিবছর এটি আয়োজন করা হয়?
তিন দশক ধরে কপ অনুষ্ঠিত হলেও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমার বদলে বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জলবায়ু তহবিল বৃদ্ধি– এসব অগ্রগতি থাকলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, সংকট মোকাবিলার গতি এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ধীর। এ প্রেক্ষাপটে কপ সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞের অনেকেই মনে করেন, ভবিষ্যৎ বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কপকে হালনাগাদ করতেই হবে। কেউ কেউ বলছেন, কপ দুই বছর পরপর হলে ভালো। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটা হলে গতি কমবে। জাতিসংঘ জলবায়ু সচিবালয়ের প্রধান সাইমন স্টিয়েল ইতোমধ্যে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের দল গঠন করেছেন, যারা আগামী দশকের জন্য কপকে কার্যকর করার নকশা প্রস্তাব করবে।
এদিকে, জরুরি ভিত্তিতে ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক জলবায়ু পদক্ষেপ নিতে কপ৩০-এ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ সময় গতকাল বুধবার ব্রাজিলে চলমান কপ৩০-এর উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতি পাঠ করেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের উপপ্রধান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ। এ সময় তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যে কোটি কোটি বাংলাদেশিকে চরম ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
নাভিদ শফিউল্লাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, আরও তীব্র ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা– এসব প্রভাব লাখো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে, ফসল নষ্ট করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে প্রান্তসীমায় ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মোট নিঃসরণের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম অবদান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু খাতে ‘দায়িত্ব, নেতৃত্ব ও আশার পথ’ বেছে নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের চারটি বড় উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন নাভিদ শফিউল্লাহ। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনডিসি ৩.০ উপস্থাপন, যার মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ২৫ শতাংশে উন্নীত করা।
দ্বিতীয়ত, কৃষি ও বর্জ্য খাতে মিথেন গ্যাস নিঃসরণ কমানোর উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। তৃতীয়ত, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ১১৩টি অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন, যেখানে গুরুত্ব পেয়েছে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও কমিউনিটি সহনশীলতা। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদি নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ। প্যারিস চুক্তির ন্যায়পরায়ণতার নীতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোকে ‘জরুরি ও গভীর’ নিঃসরণ কমাতে হবে এবং জলবায়ু সহায়তা দিতে হবে বহু গুণ। তিনি উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে শক্তিশালী সরকারি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি, অভিযোজন অর্থায়নকে বছরে ১২০ বিলিয়ন ডলারে ত্রিগুণ করার আহ্বান জানান।
প্যারিস চুক্তির ধারা ২.১(সি)-এর পুনঃপ্রতিশ্রুতি জানিয়ে তিনি বলেন, এ সামঞ্জস্য অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ দেশের টেকসই উন্নয়নকে সহায়তা করবে।
গ্লোবাল স্টকটেকের ফলাফল উল্লেখ করে নাভিদ শফিউল্লাহ পুনরায় বলেন, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা বৈশ্বিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকা আবশ্যক। তিনি ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের জলবায়ু সহায়তা-সংক্রান্ত পরামর্শমূলক মতামত উল্লেখ করে বলেন, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রশমন, ক্ষতি প্রতিরোধ, সহযোগিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা– এসব বিষয়ে দেশগুলোর বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ন্যায্যতার দাবি আরও জোরালো করে।
নাভিদ শফিউল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি কূটনীতি নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় সম্মিলিত সাহসের আহ্বান জানান তিনি।
- বিষয় :
- জলবায়ু পরিবর্তন
