অদৃশ্য কারণে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে অনিশ্চয়তা
পেশাজীবী সংগঠনে ভোট নিয়ে অনীহা
ওয়াকিল আহমেদ হিরন
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জোর দাবি থাকলেও পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোতে নির্বাচন আয়োজনে অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, হামলা, ভাঙচুরের ঘটনায় নির্বাচন আটকে আছে। তপশিল ঘোষণা করেও পরে তা পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পেশাজীবীদের নির্বাচন করার কথা বলা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতিসহ দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচন প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে হয়ে থাকে। কিন্তু সর্বশেষ গত বছর মার্চ মাসে এ নির্বাচন হয়েছিল। এর পর ২০ মাসেও আর হয়নি। চলতি বছরও শেষ হওয়ার পথে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনের জোর দাবি থাকলেও অদৃশ্য কারণে হচ্ছে না। ফলে আইনজীবীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্ট বার, ঢাকা বারসহ মহানগর এবং জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন বার সমিতির নিয়মিত কার্যক্রম চলছে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে।
সুপ্রিম কোর্ট বারের অ্যাডহক কমিটির নেতৃত্বে সর্বশেষ গত ৪ সেপ্টেম্বর এক বিশেষ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে বারের নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর ঈদের পর সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন হতে পারে। ঢাকা বারও একই পথে চলছে। ঢাকার বাইরে অনেক জেলা বারেও নির্বাচন হয়নি। এর ফলে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে চলছে পেশাজীবী এ সংগঠনটি।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সংবিধানে অ্যাডহক কমিটির বিধান না থাকায় নির্বাচন পেছানোর সিদ্ধান্তের বৈধতা ও যৌক্তিকতা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে আইনজীবীদের মধ্যে। এ বিষয়ে বিরোধিতা ও হতাশা রয়েছে খোদ বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের অনেকের মধ্যেও।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সমকালকে বলেন, আমি প্রথম থেকে নির্বাচন চেয়ে আসছি। কিন্তু বিশেষ তলবি সভা করে বারের সাধারণ সদস্যরা কমিটির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। সেখানে আমি সভাপতিত্ব করিনি। তবে আমি সব সময় নির্বাচন চাই।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, অবশ্যই দ্রুত নির্বাচন হওয়া উচিত। নির্বাচন না হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে নির্বাচনে আইনজীবীরা ভুমিকা রাখতে পারবেন না। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমেই নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা জরুরি। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। অ্যাডহক কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো। দীর্ঘ সময় এটা থাকলে আইনের শাসন ব্যাহত হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু সমকালকে বলেন, সাধারণ আইনজীবীদের পেশা পরিচালনায় আইনগত সমস্যা যে কোনো ইস্যু তুলে ধরার বৈধ মুখপাত্র সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচিত প্রতিনিধি। কিন্তু বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট বারে নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক মামলার আসামিরা আগাম জামিনের জন্য কোনো আদালতের দ্বারস্থ হতে পারছে না। কারণ কোনো কোর্ট আবেদন গ্রহণ করছেন না। এতে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অবিলম্বে নির্বাচন দাবি করেছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলাম ও জাতীয় ল-ইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এসএম জুলফিকার আলী জুনু।
বারে বর্তমান পরিস্থিতি কী
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের অনেকে আদালতে আসছেন না। সুপ্রিম কোর্ট ও ঢাকা বারে গত বছর নির্বাচনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দায়িত্বে আছে অ্যাডহক কমিটি, যা বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণে। সর্বোচ্চ আদালতের অধিকাংশ আইনজীবী এই পরিস্থিতিকে ন্যায্য মনে করছেন না।
সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে গত কয়েক বছর যে কোনোভাবে সরকার সমর্থকদের মধ্যে জয়লাভের অপচেষ্টা দেখা গেছে। ভোটকেন্দ্র দখল, জবরদস্তি করে ব্যালটে সিল মারা, আইনজীবীদের মধ্যে মারামারি ও ভোটের সময় পুলিশের হামলার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন ছিল সবচেয়ে জঘন্য।
সুপ্রিম কোর্ট বারের গঠনতন্ত্রে নির্বাচনের সময় বা তারিখ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। তবে বলা আছে, নির্বাচিত কমিটি ১ এপ্রিল (যে বছর নির্বাচিত হবে) থেকে পরবর্তী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০২৪ সালের ৬-৭ মার্চ। সভাপতি ও তিন কার্যনির্বাহী সদস্যসহ চারটিতে বিএনপি সমর্থকরা এবং সম্পাদকসহ ১০টিতে আওয়ামী সমর্থকরা মারামারি ও ভোট কারচুপির মাধ্যমে জয়ী হন।
৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর কার্যনির্বাহী কমিটির কাজে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। পরে সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে বহাল রেখে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের বিভিন্ন পদে অন্তর্ভুক্ত করে অন্তবর্তীকালীন কার্যনিবাহী (অ্যাডহক) কমিটি করা হয়। তারা সবাই বিএনপিপন্থি আইনজীবী।
অনিশ্চয়তার পথে ঢাকা বার নির্বাচন
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী কমিটির অধিকাংশ পদে জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী সমর্থক আইনজীবীরা। গত বছর ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি-জামায়াত সমর্থক আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাডহক কমিটি দিয়ে সমিতির কার্যক্রম চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বারের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট খোরশেদ মিয়া আলম সমকালকে বলেন, ‘আমরাও নির্বাচন চাই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণ আইনজীবীরা বিশেষ জরুরি সভা করে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন, সেভাবেই আমরা পরিচালনা করছি। আমাদের মেয়াদ আগামী ফেব্রয়ারি পর্যন্ত। আগামী ফ্রেবয়ারির পর নির্বাচন হবে বলে আশা করেন তিনি।
