সচিবালয়ে বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা
নির্বাচনের তপশিলের পর অনেক কাজ চলবে
‘দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে’
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর নির্বাচনকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে এমন কাজ ছাড়া সরকার সব করতে পারবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হলে সব বন্ধ হয়ে যাবে। এমন ধারণা ভুল।’ গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বেশ কিছু পাঠ্যপুস্তক কিনতে পুনরায় দরপত্রের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সরকার আশা করছে, যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া সম্ভব হবে। জানুয়ারির মধ্যেই বই দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তবে দু-একটা শ্রেণির ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা সময় লাগতে পারে। নির্বাচনের আগে কি সব শিক্ষার্থীকে বই দেওয়া সম্ভব হবে– এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে বই দেওয়ার সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন প্রকল্প অনুমোদনে বাধা থাকবে না। বাজেট বাস্তবায়নসহ অন্যান্য কাজ স্বাভাবিকভাবে চলবে। ব্যাংক একীভূতকরণ আইনের আওতায় পাঁচ ব্যাংক এক করার পাশাপাশি ৯টি অব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে না। এনবিআরকে দুই ভাগ করার কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে। রোজার আগে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা অব্যাহত থাকবে।
দেশে কোটিপতি ব্যাংক হিসাব বাড়ার কারণ জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, প্রকৃত তথ্য তিনি জানেন না। তবে অনেক দিন থেকে বাড়িতে লুকিয়ে রাখা টাকা অনেকে এখন ব্যাংকে জমা দিচ্ছেন। এ কারণেও কোটিপতি হিসাব সংখ্যা বাড়তে পারে।
নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি বাড়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতি সংকোচন করে কমানো সম্ভব নয়। সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থা আরও গতিশীল করতে হবে।
নতুন ১২ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ১২টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ বাতিল করা হয়েছে। ওই আইনের আওতায় অযাচিত প্রস্তাবের মাধ্যমে দেওয়া সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সম্মতিপত্রগুলো বাতিল করা হয়েছে। কারণ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হয়েছিল। এখন প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে এসব কেন্দ্র থেকে সরকার যে বিদ্যুৎ কিনবে, তার দাম প্রতি কিলোওয়াটে কমছে দুই থেকে তিন সেন্ট।
শুধু দাম কমের কারণে এই ১২ কেন্দ্রে বছরে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, স্বচ্ছ টেন্ডারের মাধ্যমে কম দামে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র আগে দুর্নীতির মাধ্যমে লাভবান হয়েছে। বর্তমানে স্বচ্ছ টেন্ডার হওয়ায় তারা নতুন প্রকল্পে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করছে।
অন্যান্য অনুমোদন
ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ২৫টি দর প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে চাল, ডাল, তেল, সার, বই ছাপানো, সোলার প্যানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব রয়েছে। সভায় চাল, ডিএপি সার, ইউরিয়া সার ও এমওপি সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দুর্নীতিবিরোধী দিবসের আলোচনা সভা
দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাই দুর্নীতি দমন ও সমাজের পচন ঠেকাতে পারে। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, দুদক কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ, মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী। দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম স্বাগত বক্তব্য রাখেন। দুদকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকালে দিবসটি পালন উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি উদ্বোধনকালে দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দুর্নীতিবাজদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত না করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজ-চাঁদাবাজদের ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করলে দুর্নীতির লাগাম অনেকটাই টেনে ধরা সম্ভব হবে।
আলোচনা সভায় অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কাজের পদ্ধতি উন্নত করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর্থিক খাত নিয়ে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বড় বিষয়। বিগত দিনে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। সে তুলনায় শাস্তি কতটুকু হচ্ছে–এই প্রশ্ন রয়েই গেছে।
বিশেষ অতিথি বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, শুধু শাস্তি দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে যারা অপরাধ করেছেন তাদের রাজনৈতিক এলিটরা কোটি টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার করে দিয়েছেন।’ জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ওইসব ব্যক্তিকে এবারের জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে নিজেদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন সময় সমাজের উপযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি ঢুকে গেছে সেটিকে ধীরে ধীরে নির্মূল করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুদক মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী, আবদুল্লাহ-আল-জাহিদ, আক্তার হোসেন, আবু হেনা মুস্তফা জামান, মোকাম্মেল হক, দুদকের পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, উপসহকারী পরিচালকরা।
- বিষয় :
- অর্থ উপদেষ্টা
- সালেহউদ্দিন আহমেদ
