ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিজয়ের মাস

জীবন দিয়েও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি তিন যুবক

জীবন দিয়েও মুক্তিযোদ্ধার  স্বীকৃতি পাননি তিন যুবক
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সকালে যশোরের পালবাড়ি মোড় থেকে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যান মুক্তিযোদ্ধারা। ক্যাপ্টেন হুদার নেতৃত্বে একটি ব্যাটেলিয়ন নড়াইল অভিমুখে, অন্যটি মিত্র বাহিনীর কমান্ডার কর্নেল মনিন্দর সিংয়ের নেতৃত্বে খুলনা অভিমুখে রওনা হয়। প্রথমে চাঁচড়া মোড়, তারপর পুলেরহাট, এরপর সাড়াপোল ও সিরাজসিংগা গ্রামের মাঝখান দিয়ে কুয়াদা বাজারে ওঠে দ্বিতীয় দলটি। 
এরপর দলটি সকাল ১০টার দিকে কেশবপুর-সাতক্ষীরা সড়কের কানায়তলা মাঠে পৌঁছলে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সদস্যরা অতর্কিত গুলি চালায়। এতে সম্মুখ লড়াই করতে করতে রামনগর রেলক্রসিং পার হন তারা। এ সময় তিন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলী, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। পাশাপাশি মিত্র বাহিনীর (ভারতীয়) ১৫ জন সৈন্য নিহত হন এবং আরও ১৫ জনকে মিলিটারি গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হয়।  

পরে শহীদ তিনজনকে ১১ নম্বর রামনগর ইউনিয়নের রাজারহাট রেলক্রসিংয়ের পাশে এক কবরে চাপা দেওয়া হয়। এরপর আব্দুল মান্নানকে (কথক) নিয়ে মুক্তিবাহিনী খুলনার দিকে রওনা হয়। বিকেলে রাজহাট (নোয়াপাড়া) থেকে কর্নেল মনিন্দর সিং ও আরও দুটি গাড়ি নিয়ে যশোর টাউন হল ময়দানে আসে। এরপর বিকেল ৫টার দিকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ ভারত থেকে আসা একটি হেলিকপ্টার থেকে নামেন। এক দিন পর ওই তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার লাশ কবর থেকে উঠিয়ে সিরাজসিংগা গ্রামে দাফন করা হয়। তাদের সবাই বাড়ি ওই গ্রামেই।  

এই বীরত্বগাথা পাওয়া গেছে যশোর সদর থানার সিরাজসিংগার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা জার্মান প্রবাসী মো. আব্দুল মান্নানের লিখিত চিঠিতে। এই চিঠি তিনি ওই তিন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলেন। 

আব্দুল মান্নান সমকালকে বলেন, ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবস। এদিন আমার তিন সহযোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। কিন্তু দীর্ঘ ৫৪ বছরেও শহীদের তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন ওই তিনজনের বিষয়ে সত্যতা যাচাই করে যশোর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন বেশ কয়েক বছর আগে জমা দেয়। পরে ২০২২ সালের ২০ মে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) তিনজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে প্রস্তাব পাঠানো হলেও তা এখনও ফাইলবন্দি। 

বৃহত্তর যশোর জেলা বিএলএফের মুক্তিযুদ্ধকালীন উপপ্রধান মো. রবিউল আলম সমকালকে বলেন, তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ঘটনা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। একাত্তরে সম্মুখযুদ্ধে তারা মারা যান। কিন্তু সরকারি তালিকায় তাদের নাম নেই। আমরা যারা বেঁচে আছি, আমাদের জন্যও এটা দুর্ভাগ্যজনক।  
জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলীর বাবার নাম মো. সদর আলী গাজী; মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সাত্তারের বাবার নাম সবর আলী গাজী ও মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মালেকের বাবার নাম মোসলেম উদ্দিন গাজী (মুসা)।
একাত্তরে ওই তিন যুবক ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে তারা আর বাড়ি ফেরেননি। গরিব অসহায় পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাদের কেউ স্মরণে রাখেনি। তাদের কবরের চিহ্নও এখন নেই। তাদের পরিবারের কোনো সদস্যও বেঁচে নেই। এলাকাবাসী তাদের স্বীকৃতির জোর দাবি জানান। 
 

আরও পড়ুন

×