ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিবিএসের জরিপ

বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বাড়ছে ঝুঁকি

বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বাড়ছে ঝুঁকি
×

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:০৩

দেশের ৭১ শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রতি ৫০ শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে, মানব বর্জ্যের স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা নেই ৬৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও নাজুক। ৯৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য উপযোগী টয়লেট নেই। এই পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি, অস্বস্তি ও শিক্ষায় বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে। বিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও টয়লেটের অপ্রতুলতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রয়েছে, যা দূষণ ও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত জরিপের ওপর তৈরি প্রতিবেদন গতকাল রোববার প্রকাশ করে বিবিএস। গত বছরের ২৬ জুন থেকে ১৭ জুলাই সময়ে সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাসপাতাল, ক্লিনিক, উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশ অফিস জরিপ পরিচালনায় সহায়তা দেয়। 

জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের কর্মকর্তা ফারুক আদ্রিয়ান। বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। জরিপে ফলাফল উপস্থাপন করেন বিবিএসের এসডিজি সেলের ফোকাল পয়েন্ট মো. আলমগীর হোসেন। 

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, দেশের ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ স্কুলে এবং ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে উন্নত পানির উৎসে প্রবেশগম্যতার সুবিধা রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে উচ্চ হার। তবে মৌলিক পানি সেবার সংজ্ঞা অনুযায়ী উন্নত পানির উৎস প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরে থাকার নিয়ম রয়েছে। এই মানদণ্ড পূরণ করে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ স্কুল এবং ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এই মানদণ্ড পূরণ করে। তবে দেশের মাত্র ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী করে পানি ব্যবহার সুযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ হার আরও কম, মাত্র ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার সুবিধা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে পানি ও সাবানের অভাব রয়েছে। মাত্র ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ বিদ্যালয় এবং ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হাত ধোয়ার ব্যবস্থার মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে। অর্থাৎ, প্রায় ৪৮ শতাংশ বিদ্যালয় এবং ৯৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার মানসম্মত ব্যবস্থা নেই। এ কারণে কার্যকর স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন ব্যাহত হচ্ছে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। 

জরিপ বলছে, নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধাও অপর্যাপ্ত। মাত্র ২০ দশমিক ৭ শতাংশ স্কুলে কিশোরীদের জন্য পৃথক, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট রয়েছে। মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ স্কুল মাসিককালীন মৌলিক সেবার সুযোগ রয়েছে। এসব সুবিধার ঘাটতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি, অস্বস্তি এবং শিক্ষায় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে তোলে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৮ দশমিক ৩ শতাংশ বিদ্যালয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। মাত্র ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম। এই মানদণ্ড অনুযায়ী বিপজ্জনক বর্জ্যের নিরাপদ পৃথকীকরণ, প্রক্রিয়াকরণ ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। 

জরিপের তথ্য সংগ্রহকালে আগের ১২ মাসে ২৪ দশমিক শতাংশ স্কুল এবং ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে। এতে বহু ক্ষেত্রে পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর সরাসরি ক্ষতি হয়েছে। এই ঝুঁকির পরও জলবায়ু সহনশীল ওয়াশ ব্যবস্থার ওপর জ্ঞান ও বাস্তবায়নের হার খুবই কম। মাত্র ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ বিদ্যালয় ও ৯ দশমিক ৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার বিষয়ে অবগত। এ কারণে আগামীতে জলবায়ুজনিত অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হচ্ছে, এ খাতে বরাদ্দ অপ্রতুল বরাদ্দ। মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ বিদ্যালয় ও ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ রয়েছে। 

প্রতিবেদনের সুপারিশ অংশে বলা হয়, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কিছু অর্জন রয়েছে। তবে একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্যতা, গুণগত মান, প্রবেশগম্যতা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতির চিত্র প্রকাশ করে। এসব ঘাটতি দূর করতে টেকসই বিনিয়োগ, সক্ষমতা জোরদারকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। 

আরও পড়ুন

×