ছায়ানট-উদীচী ও গণমাধ্যমে হামলার বিচার দাবি
প্রতিবাদে গানে গানে সংহতি ও দেশব্যাপী বিক্ষোভ
ছবি : সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৪:০৭
আবহমান বাংলা-সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর ধারাবাহিক সহিংস হামলার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ছায়ানটের উদ্যোগে ‘গানে গানে সংহতি-সমাবেশ’ এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ ও মশাল মিছিলের মাধ্যমে সংস্কৃতিসেবীরা এ হামলার ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত হয় ‘গানে গানে সংহতি-সমাবেশ’।
এতে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য, নালন্দার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অংশ নেন। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন খুরশীদ আলম, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, শফি আহমেদ, অদিতি মহসিন, মফিদুল হক, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মকবুল হোসেন, আব্দুল ওয়াদুদ, সুমন চৌধুরী, রোকাইয়া হাসিনা নীলি, মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না, শিল্পী রফিকুন নবী, শিল্পী আব্দুল মান্নান, শিল্পী বুলবুল ইসলামসহ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন বক্তব্যে ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও বাউল সমাজের ওপর সাম্প্রতিক সহিংস হামলা এবং বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার আবহমান বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতিসত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। গণমাধ্যমের ওপর বেপরোয়া হামলা এবং শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত নিরপরাধ হত্যাকাণ্ড দেশের নিরাপত্তাকে ব্যাপকভাবে বিপন্ন করছে। এ পরিস্থিতিতে নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমে জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
সমাবেশের শুরুতে সবাই একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন– ‘ও আমার দেশের মাটি’। পরে পরিবেশিত হয় একে একে ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’, ‘চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘মানুষ ছেড়ে খ্যাপা রে তুই’, ‘মানুষ হ মানুষ হ’, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’, ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন’, ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান’সহ বহু প্রতিবাদী ও দেশাত্মবোধক গান। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সংহতি-সমাবেশের সমাপ্তি ঘটে।
অন্যদিকে, উদীচী ও ছায়ানটের কার্যালয় ও গণমাধ্যমে হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও শাখায় বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে গতকাল ঢাকায় বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রেস ক্লাবের বিপরীতে সত্যেন সেন চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মশাল মিছিল কর্মসূচি পালন করে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভ, হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াত, শিক্ষা সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব রুস্তম আলী খোকন, দৈনিক সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সংগঠনবিষয়ক সম্পাদক শেখ আনিসুর রহমান, সহসভাপতি শিবানী ভট্টাচার্য, বেলায়েত হোসেন প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সহসাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ।
বক্তারা বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হামলায় উদীচী কেন্দ্রীয় কার্যালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডে উদীচীর ৫৭ বছরের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, বাদ্যযন্ত্র ও আসবাব পুড়ে গেছে। তাদের অভিযোগ, ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার কার্যালয় ও ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর থেকেই উদীচীর ওপর প্রকাশ্য হুমকি ও সামাজিক মাধ্যমে উস্কানি দেওয়া হচ্ছিল। তবুও প্রশাসন কোনো কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়নি।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম বলেন, স্বাধীনতার আগ থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে উদীচী সাংস্কৃতিক হাতিয়ার নিয়ে রাজপথে থেকেছে। যে অপশক্তি বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তারাই আজ উদীচী, ছায়ানট ও গণমাধ্যমে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু জনগণ সেই ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবে না। তিনি বলেন, এ হামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উদীচী আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। সমাবেশ শেষে একটি মশাল মিছিল শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
- বিষয় :
- ছায়ানট
- উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
