ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এভারকেয়ারের সামনে কেউ করছেন আর্তনাদ, কেউ নীরবে মুছছেন চোখ

এভারকেয়ারের সামনে কেউ করছেন আর্তনাদ, কেউ নীরবে মুছছেন চোখ
×

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ছুটে এসেছেন বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। ছবি-সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২২:১৮

হাসপাতালের হিমঘরে ‘প্রিয় নেত্রী’ খালেদা জিয়া। চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। আপসহীন নেত্রীর মরদেহ দেখতে পাবে না জেনেও হৃদয়ের টানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ছুটে আসছেন বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। কারও হাতে কালো পতাকা, কারও হাতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি। কেউ আর্তনাদ করছেন, কেউ নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছছেন। দুই হাত তুলে তাঁর জন্য দোয়া করেন কেউ কেউ। এক শোকাবহ পরিবেশ। মঙ্গলবার সরজমিনে এমন দৃশ্য দেখা যায়। 

এদিকে হাসপাতাল এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এভারকেয়ারে রোগী ও তাদের স্বজনদের আসা-যাওয়ার জন্য রাস্তার একপাশে ফাঁকা রাখা হয়। হাসপাতালে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ না করার জন্য হাত মাইকে বারবার ঘোষণা করা হয়।

দুপুর সোয়া দুইটায় এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনের সড়কের পাশে বেগম খালেদা জিয়ার সাদাকালো একটি ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন মোহাম্মদ শামীম নামে এক সৌদি প্রবাসী। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমি বিএনপির সক্রিয় কর্মী নই। মিছিল মিটিংয়েও যাইনি কখনও। তবে বিএনপিকে সমর্থন করি। আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়াকে ভালে লাগে। তাঁর দেশপ্রেম আমাকে মুগ্ধ করে। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা, ত্যাগ তা ভুলবার নয়। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে ঘরে বসে থাকতে পারিনি। 

তিনি জানান, তার বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানায়। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ছুটে আসেন হাসপাতালের সামনে।
 
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে জড়ো হন। মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ আন্দোলনের দিনের কথা বলছিলেন, কেউ কারাবন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়ার দৃঢ় অবস্থানের কথা স্মরণ করছিলেন।

জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদের অনেকেই হাসপাতালে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে ব্যারিকেড টেনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বাধা দেয়। অবশ্য দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রায় সবাই হাসপাতালের ভেতরে অবস্থান নেন। সেখানে ছিলেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। এছাড়াও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, খালেদা জিয়ার চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ অনেকে। বাইরে হাসপাতালের ফটকের সামনে অবস্থান নেন তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। দলের চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে তারা সবাই শোকাহত।

হাসপাতালের অডিটরিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সংবাদটি নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে হবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা করছিলাম, তিনি আবারও সুস্থ হয়ে উঠবেন। শত চেষ্টা করেও খালেদা জিয়াকে বাঁচানো গেল না। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর জানাতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার।


 
হাসপাতালের সামনের সড়কে রিকশায় এক ফ্রেমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি নিয়ে বসেছিলেন রিকশা চালক আনোয়ার। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া আমার নেত্রী। গণতন্ত্রের মা। তাঁর জন্য দোয়া করি যেন জান্নাতবাসী হোন।

গাড়িচালক মাসুদুর রহমান বলেন, তিনি গতকাল সারারাত হাসপাতাল এলাকায় ছিলেন। রাত তিনটার দিকে বাসায় গেলেও ভোর পাঁচটার দিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খবর পেয়ে আবার ফিরে আসেন। তিনি বলেন, তখন থেকে এখানেই আছি এই দিনটি আর দশটা দিনের মতো ছিল না। ছিল শুধু শোক, নীরবতা আর এক অধ্যায়ের চিরবিদায়। 

এদিকে হাসপাতাল গেটের বিপরীতে মূল সড়কের পাশে ১০ থেকে ১৫ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় কোরআন খতমের আয়োজন করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল। এ কর্মসূচির তদারকির দায়িত্বে থাকা যুবদল কর্মী রুবেল বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক পালনের পাশাপাশি যুবদলের কোরআন তেলওয়াতের আয়োজন করা হয়েছে। 

বিএনপির নেতাকর্মীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেসময় ঠিকমতো চিকিৎসাও দেওয়া হয়নি তাঁকে।  

কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির দলীয় মনোনীত প্রার্থী ফজলুর রহমান বলেন, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংলাদেশের ইতিহাস থাকবে, ততদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু আমাদের জন্য একটা বিপর্যয়। বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয়। এটি কাটিয়ে উঠতে সমস্ত শক্তি এবং সাহস নিয়ে আমাদের দাঁড়াতে হবে। 

কান্নার রোল নয়াপল্টনে
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হন নেতাকর্মীরা। নেত্রীর মৃত্যুতে কান্নার রোল পড়ে যায় তাদের মধ্যে। অনেককে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদের পর থেকেই নয়া পল্টনে কোরআন খতম শুরু হয়। সকাল ১০টা থেকে দলীয় কার্যালয়ের নিচতলায় ওলামা দল কোরআন খতম শুরু করে। বুধবার জানাজার আগ পর্যন্ত কোরআন খতম চলবে।

গুলশান কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ভিড়    
সকাল গড়াতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা গুলশানের কার্যালয়ের সামনে আসতে থাকেন। তবে এদিন দলীয় স্লোগান নয়, শোকই ছিল প্রধান ভাষা। অনেক নেতা-কর্মীকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা যায়। কেউ বলছিলেন, ‘এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।’

আরও পড়ুন

×