ফিরে দেখা ২০২৫
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বছরজুড়ে আলোচনা, চিকিৎসায় সংকট
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৪৯ | আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:০৪
২০২৫ সালে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও সেবার মানোন্নয়নের পরিবর্তে আলোচনায় ছিল প্রশাসনিক অচলাবস্থা, চিকিৎসকদের অসন্তোষ এবং নীতিগত দুর্বলতা। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব এবং ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর’ কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় থাকা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য খাত আরও নাজুক হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত বছরের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতের অস্থিরতা কমেনি, বরং বেড়েছে। এ সময় পদায়ন ও বদলি নিয়ে বিতর্ক, চিকিৎসকদের ধারাবাহিক আন্দোলন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কৌশলের অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে অভিযোগ: জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনার ঘাটতির কথা জানিয়েছেন আহত ব্যক্তি ও তাদের স্বজনরা। এতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা ও মানবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, বাস্তবতা ভিন্ন: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ সময়ে নীতিমালা হালনাগাদ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এতো অল্প সময়ে সমাধান সম্ভব নয়, তবে সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের মত ভিন্ন। তাদের মতে, ২০২৫ সালে কাগজে-কলমে কিছু অগ্রগতি হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আগের মতোই রয়ে গেছে।
রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম নেই: দেশে রোগ নিয়ন্ত্রণে বছরজুড়ে কার্যকর কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে উদাসীনতা ছিল। আগের সরকারের পথেই হেঁটেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে নীরবে বেড়েছে এডিস মশাবাহিত এই রোগ। ৩১ জানুয়ারি থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক লাখ ৭৬৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৪০৯ জন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দায়িত্ব থাকলেও দুই বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।
ওপি না থাকায় চিকিৎসাসেবায় স্থবিরতা: দেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতের অধিকাংশ কার্যক্রম পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বর্তমানে ওপি কার্যকর না থাকায় পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গত জুলাইয়ে ‘পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচি (পঞ্চম এইচপিএনএসপি)’ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও অনুমোদন মেলেনি। ফলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান, পুষ্টিসহ ৩৭টির বেশি কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে।
বরাদ্দ ও হাসপাতালের চিত্র: চলতি অর্থবছর জাতীয় বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে, যা গত দুই দশকের গড়ের কাছাকাছি। অন্তর্বর্তী সরকারও এই ধারা থেকে বের হতে পারেনি। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আগের মতোই রয়ে গেছে। গত ৭ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান, দৈনিক গড়ে ১৫ হাজার মানুষ হাসপাতালে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এ সংকট কাটবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নষ্ট যন্ত্রপাতি এক বছরেও পুরোপুরি চালু হয়নি। রাজধানীর বাইরেও একই চিত্র।
সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন: নাগরিক সংগঠন সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশের আহ্বায়ক ডা. কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর বলেন, স্বাস্থ্য খাতে ব্যর্থতা অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিরতা ও সিদ্ধান্তহীনতা বেড়েছে। ভুল পদায়ন ও বদলির কারণে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়েছে। অপারেশনাল প্ল্যান কার্যকর না থাকায় কিছুই ঠিকভাবে চলছে না। তিনি আরও বলেন, সংস্কারের জন্য ৩২টি সুপারিশ করা হলেও বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। তবে বড় ধরনের দুর্নীতির খবর না থাকায় আমরা কিছুটা আশাবাদী।
কী সংস্কারের কথা বলছে মন্ত্রণালয়: স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ১০টি মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে। অতিকেন্দ্রিকরণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলা, স্বচ্ছতার অভাব, দুর্বল নেতৃত্ব ও বরাদ্দের ঘাটতি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে মেডিকেল শিক্ষায় সব ধরনের কোটা বাতিল, অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন, মেডিকেল কলেজের আসন পর্যালোচনা, ইজিপির মাধ্যমে সব ক্রয় বাধ্যতামূলক করা এবং ইডিসিএল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল ইন্টার্নশিপ ১৮ মাস করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকে রাখা উচিত। আর স্বাস্থ্যের কেন্দ্রে থাকবে ওষুধ।
- বিষয় :
- স্বাস্থ্য খাত
- সালতামামি ২০২৫
- ফিরে দেখা
