ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘আলতাফ হোসেন এক অদ্ভুত জাদুকর’

জন্মবার্ষিকীতে স্মারকগ্রন্থ ‘জন্ম ভবঘুরে’ প্রকাশ

‘আলতাফ হোসেন এক অদ্ভুত জাদুকর’
×

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে অধ্যাপক আলতাফ হোসেনের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর ‘জন্ম ভবঘুরে’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে অতিথিরা। গতকাল শনিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

যিনি চারাগাছের যত্ন নেন, তিনি মানুষের যত্ন নিতে জানেন। যিনি ভাঙা জিনিসেও প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পান, তিনিই পারেন কেবল ‘মানবিক মানুষ’ গড়তে। এমনই এক ব্যক্তিত্ব শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিজন অধ্যাপক আলতাফ হোসেন। গতকাল শনিবার রাজধানীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পঞ্চম তলায় এই ‘আলোর ফেরিওয়ালার’ ৭৮তম জন্মবার্ষিকী ও তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ ‘জন্ম ভবঘুরে’-এর প্রকাশনা উৎসব আনন্দঘন আড্ডায় রূপ নেয়।

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কথাশিল্পী ও গবেষক হাসনাত আবদুল হাই। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সঞ্চালনা করেন ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আলতাফ হোসেনের বর্ণময় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন বক্তারা। অভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আলতাফ হোসেন এক অদ্ভুত জাদুকর। রাত ৩টায় ফোন করে হয়তো বলবেন, কোজাগরী পূর্ণিমা দেখছো? তাঁর ড্রইংরুম মানেই খোলা আকাশ আর গাছপালা। একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখি কাঁঠাল গাছের মাথায় স্পিকার বাঁধা, সেখান থেকে ভেসে আসছে বেগম আখতারের গান। এমন নান্দনিক পাগলামি শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব।’

ছাত্রী আসমা সাঈদ বলেন, “স্যার সব সময় কাটাকুটি করেন। পুরোনো ক্যালেন্ডার, আবর্জনা থেকে কেটেকুটে তিনি অসাধারণ সব শিল্প তৈরি করেন। আসলে এই কাটাকুটির মাধ্যমে তিনি আবর্জনার ভেতর থেকে একটি সুন্দর সাজানো জীবন বের করে আনেন। বিধাতা হয়তো কেবল আলতাফ স্যারকেই পাঠিয়েছেন এমন ‘মানবিক মানুষ’ বানাতে।”

আলতাফ হোসেনকে ‘ভবের পাগল’ বা দুনিয়ার প্রেমে মগ্ন মানুষ হিসেবে অভিহিত করেন ফরিদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘নিজের হাতে ক্রেস্ট বানানো থেকে শুরু করে স-ফিশের (করাত মাছ) কাঁটা দিয়ে বাক্স তৈরি– সবই তিনি করেন পরম মমতায়। কোনো প্রতিদান ছাড়াই তিনি ফরিদপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে আগলে রেখেছেন।’ 

আলতাফ হোসেনকে ৭৮ কোটি গোলাপের শুভেচ্ছা জানিয়ে চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, ‘জীবনের মাঝের পৃষ্ঠাটি তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতি দিয়ে ভরপুর করে রেখেছেন। এমনকি পাগলদের নিয়ে সম্মেলন করার মতো সাহসী ও মানবিক উদ্যোগও তাঁর নেতৃত্বেই 
সম্ভব হয়েছে।’

পাখি বিশারদ ইনাম আল হক আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ এক শহরের দেশ। বুদ্ধদেব বসুর মতো আলতাফ হোসেনও যদি ঢাকায় থাকতেন, তবে তাঁর পরিচিতি থাকত আকাশচুম্বী। তবে তিনি ফরিদপুরে থেকে যে আনন্দ ও আলো ছড়িয়েছেন, তা অতুলনীয়।’

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অধ্যাপক আলতাফ হোসেন ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একে অপরকে নিয়ে খুনসুটি। অধ্যাপক আলতাফ হোসেন নীলফামারীর একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘একবার সায়ীদ স্যার যেতে পারেননি বলে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে সবাই আমাকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ভেবে ভুল করেছিল। আমিও স্যারের নামেই বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়ে এসেছিলাম। সেদিন বুঝেছিলাম, দুর্নীতিতে অনেক আনন্দ!’ নিজ বক্তব্যের শেষে তাঁর জন্মদিন উদযাপনের জন্য সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ জানান তিনি।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘আলতাফ সাহেবের বয়স ৭৮ হলেও তিনি এখনও তরুণের মতোই প্রাণবন্ত। একবার তাঁকে নিয়ে গোপালগঞ্জ গিয়েছিলাম। কিন্তু স্ত্রীর ভয়ে তিনি চার-পাঁচ দিন পরেই কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এসেছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি অনন্য, ফরিদপুরের সংস্কৃতিকে তিনি একাই অনেকটা পথ এগিয়ে নিয়েছেন।’

সভাপতির বক্তব্যে হাসনাত আবদুল হাই বলেন, ‘আলতাফ হোসেনের মুগ্ধতা এড়ানো কঠিন। তিনি সফল শিক্ষক এবং নিপাট সামাজিক মানুষ। তাঁর মতো মানুষেরা আছেন বলেই সমাজটা এখনও সুন্দর।’
স্মারকগ্রন্থ ‘জন্ম ভবঘুরে’ যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন শরীফ খান ও লিয়াকত হিমু। অনুষ্ঠানে আলতাফ হোসেনের জীবন ও কর্মের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয় 
এবং গানের মধ্য দিয়ে এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ অধ্যাপক আলতাফ হোসেনের জন্মদিন উপলক্ষে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে 
শুভেচ্ছা জানান।

আরও পড়ুন

×